ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব রচনা

ভূমিকা

বাংলায় একটি সুন্দর প্রবাদ আছে। সেই প্রবাদটিতে বলা হয়েছে, ছাত্র হয়ে শুধু পড়াশােনা করলেই হবে না। পড়াশােনার সঙ্গে খেলাধুলাও করতে হবে।

খেলাধুলা বাদ দিয়ে শুধু পড়াশােনা করলে, সে বােকা ছেলে হতে পারে। সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম দেহ, সুস্থ মানসিকতার জন্য খেলাধুলার প্রয়ােজনীয়তা অনেক।

সত্যিই তাে, খেলাধুলার মাধ্যমে শুধু শরীরচর্চা নয়, নেতৃত্বশক্তি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব প্রভৃতি চারিত্রিক গুণের প্রকাশ ঘটে।

চরিত্রগঠনের প্রথম পাঠ (পরিবার জীবন ও বিদ্যালয় জীবন)

জীবনের শুরু থেকে চরিত্রগঠনের প্রতি সচেতন হতে হবে।

এ বিষয়ে মানুষ শিশু বয়সেই পিতা-মাতা, অভিভাবক ও আত্মীয়-পরিজনের নিকট থেকে বা পরিবার জীবনের গণ্ডির মধ্যেই এই পাঠ নেয়।  তারপর সে প্রবেশ করে ছাত্রজীবনে।

তখন তার জীবনের পরিধি, মেলামেশার গণ্ডি হয় প্রসারিত। এখানেই একে অপরকে ভালােবাসতে শেখে। একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে শেখে।

চারিত্রিক গুণাবলির বিকাশ

সহযােগিতা, সততা ও সেবা: খেলাধুলার মধ্য দিয়ে পরস্পরের মধ্যে সহযােগিতার মনােভাব গড়ে ওঠে। দলগত সাফল্যলাভের প্রচেষ্টা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এক দৃঢ় ঐক্যবােধ জাগায়।

প্রকৃত খেলােয়াড়ি মনােভাবই (sportsmen-spirt) ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সততার উদ্‌বােধনে সাহায্য করে। এইভাবে তাঁদের আচরণের মধ্যে চরিত্রের অন্যতম গুণ যে সততা-তার বিকাশ ঘটে।

ছাত্র জীবন ও স্বপ্ন দেখা

ছাত্রজীবন হল গড়ে ওঠার জীবন। শৈশব থেকে কৈশাের এবং আরও পরে কৈশাের থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত প্রসারিত সময়টির প্রায় সবটাই জুড়ে থাকে ছাত্রজীবন।

শৈশব ও কৈশােরের দিনগুলােতে আমাদের কৌতূহল থাকে অপরিসীম।

পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার একটু একটু করে আমাদের সামনে তখন মেলে ধরে তার রহস্যময় পেটিকাটি। সেই জ্ঞানের জগতে আমরা পা-পা করে ঢুকি, ঢুকি আর চমকিত হয়ে উঠি।

Read More:  এক স্বপ্নের উড়ান : এ পি জে আব্দুল কালাম রচনা

সাহিত্য আমাদের মনে জাগিয়ে তােলে স্বপ্ন দেখা, বিজ্ঞান মনে গেঁথে দেয় তার অসম্ভবকে সম্ভব করার জাদুমন্ত্র। গণিত দেয় কঠোর বাস্তব বুদ্ধি, দর্শন দেয় যুক্তিনিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ।

ছাত্রজীবনকে এইভাবে ভাসিয়ে নিয়ে চলে শিক্ষণীয় বিষয়গুলাে।

শরীরচর্চার গুরুত্ব

শরীর ঠিক রাখার জন্য চাই শরীরচর্চা। উন্নত দেশে (জাপানে) কলকারখানায় কাজশুরুর আগে এই ব্যায়ামচর্চা করা হয়ে থাকে। এর দ্বারা কর্মশক্তির বিকাশ হয়, কাজে মন আসে।

সেজন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টিফিনের সময় বা অন্য সময়ে খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে।

সবাই জানে স্বাস্থ্যই সম্পদ। স্বাস্থ্যবান দেহ সুখ-সম্পদের অধিকারী। যারা অসুস্থ, দুর্বল, রুগ্ন তারা জীবনযুদ্ধে পদে পদে পরাভূত হয়।

কিন্তু একথা আমাদের ভুললে চলবে না, ছাত্রজীবন শুধু মন-ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। এই সময় মনের সঙ্গে দেহের পরিপুষ্টিও দরকার।

শৈশব ছাড়িয়ে কৈশাের এবং কৈশাের ছাড়িয়ে আমরা যখন যৌবনের দিকে এগােচ্ছি, তখন আমাদের শরীরেরও অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। শরীরে আসছে বলিষ্ঠতা।

আসছে বাড়ন্ত ক্ষুধা, বাড়ছে পেশির ক্ষমতা। শরীরচর্চা এসময় খুবই জরুরি।

শরীরকে অবহেলা করলে পরে তা পঙ্গু হতে পারে।

নানা ধরনের ব্যাধি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ক্ষীণতর হতে পারে চোখের নজর। কান হতে পারে বধির। হজমের গােলমাল হওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

খেলাধুলার গুরুত্ব

শরীরের এইসব ঝামেলা এড়িয়ে, প্রকৃত শক্তির অধিকারী হতে হলে ছাত্রজীবনে খেলাধুলার চর্চা দরকার। সুস্থ জীবনলাভের জন্য চাই খেলাধুলা। আমাদের দেশে সবচেয়ে চালু হল ফুটবল খেলা।

খেলাটি জনপ্রিয়ও। শহরে-নগরে গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র এই খেলার প্রচলন রয়েছে।

প্রতিটি স্কুলেও এই খেলার ব্যবস্থা আছে। সুতরাং এই ফুটবল খেলা প্রতিটি ছাত্ৰই খেলতে পারে। এছাড়া ক্রিকেট, ভলিবল খেলাতেও ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করতে পারে।

হাডুডু ও কবাডি খেলাও বেশ আকর্ষক খেলা। এইসব খেলায় বেশি খরচও লাগে না।

অথচ শরীরের পক্ষে খুবই উপযােগী। এ খেলাতেও ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের নিয়ােগ করতে পারে। এইসব খেলা বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের দেহের পুষ্টিসাধনে বিশেষ সহায়ক।

Read More:  বিশেষ্য পদ ও তার শ্রেণী বিভাগ বলতে কি বুঝ

প্রত্যক্ষ ফল

খেলাধুলার মধ্য দিয়ে দেহ নীরােগ ও কর্মঠ হয়। তখন জ্ঞান অর্জনের জন্য পরিশ্রম করার মধ্য দিয়ে বিদ্যার্থী জীবনে সহজেই সাফল্য পায়।

এই নীরােগ দেহ ও সুস্থ মন নিয়ে বিদ্যা অর্জনের মধ্য দিয়ে ছাত্ররা উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে অনুপ্রাণিত হয়।

পাশ্চাত্য দেশে খেলাধুলা

পাশ্চাত্য দেশে খেলাধুলা জাতীয় জীবনের সঙ্গে অঙ্গীভূত। কেননা তারা মনে করে খেলাধুলা লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্লান্তিনাশ, আমােদ উপভােগ ও মানসিক পরিতৃপ্তির উৎস।

জার্মানি খেলাধুলাকে জাতির চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান উপায় হিসাবে গুরুত্ব দিয়েছে।

জার্মানিতে মােট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ খেলাধুলার প্রতিযােগিতায় অংশ নিচ্ছে এবং এদের উৎসাহিত করার জন্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন খেলােয়াড়দের।

কিশাের বয়সে খেলাধুলা

কিশাের বয়সে শরীরচর্চার প্রয়ােজনীয়তা যথেষ্ট। তাই সব দেশের বিদ্যালয় শিক্ষায় খেলাকে পাঠ্যক্রমে রাখা হয়। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলার বিষয়টিকে বিদ্যালয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দৌড়ঝাপ, ড্রিল, ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, হা-ডু-ডু, সাঁতার, যােগব্যায়াম, খাে-খাে প্রভৃতি খেলাধুলা ভারতবর্ষের স্কুলগুলিতে অবশ্য করণীয়।

এইসব খেলাধুলার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের শুধু শরীর গঠনই হয় না, চারিত্রিক গঠনও হয়। খেলার মাঠে খেলােয়াড় সুলভ মনােভাব সৃষ্টি হয়।

খেলাধুলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প ইত্যাদি শারীরিক কসরতগুলােও। জড়িত রয়েছে ব্যায়াম। ওই ব্যায়াম এবং দৌড় ইত্যাদিও নিয়মিত অনুশীলন করা যেতে পারে।

এই সবের অনুশীলন দেহকে মজবুত করতে পারে। দিতে পারে শারীরিক শক্তি।

মনের ও বুদ্ধির অনুশীলনের সঙ্গে শরীরের সুস্থতা সব ছাত্রছাত্রীদের কাম্য। শাস্ত্রকাররা লিখেছেন, শরীরং আদ্যং, খলু ধর্মসাধনম। অর্থাৎ সবরকম অধ্যয়নই বৃথা হয়ে যায়, যদি না শরীর সুস্থ এবং সবল থাকে।

চরিত্র গঠনে খেলাধুলা

খেলাধুলা ছাত্রদের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। খেলার মাঠে পারস্পরিক সহযােগিতা, উদার মনােভাব, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা প্রভৃতি গুণগুলি জাগ্রত হবার অবকাশ পায়।

বিদ্যালয়ে ছাত্রদের পড়াশােনার একঘেয়েমি দূরীভূত হয় খেলাধুলার মাধ্যমে।

তাছাড়া জীবন যেখানে একটা খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়, সেখানে খেলাধুলার মাধ্যমে একটা উদার মনােভাব বা ‘স্পাের্টসম্যান স্পিরিট’ গড়ে ওঠে- যার দ্বারা তাদের জীবন হয় সুন্দর।

Read More:  একটি গ্রামের আত্মকাহিনী নিয়ে বাংলা রচনা

জাতি গঠনে খেলাধুলা

সুস্থ সবল জাতিগঠনে খেলাধুলা বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করে। তাই জীবনের ঊষাকাল থেকে প্রতিটি মানুষের শরীরচর্চার জন্য খেলাধুলার প্রয়ােজন। খেলাধুলা মানে সমবেত ব্যায়াম।

শরীরচর্চা ও শরীর গঠন যেমন তাতে হয়, তেমনি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রবণতারও শিক্ষা লাভ করা যায়। একের সংকল্প তখন মিশে যায় দলগত সংকল্পে।

জাতীয়তাবােধে খেলাধুলা

খেলাধুলা আমাদের জাতীয়তাবােধকে উদ্দীপ্ত করে। খেলাধুলায় দেশের সাফল্যে দেশবাসী জাতীয়তাবােধে গর্বিত হয়।

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযােগিতায় অভিনব বিন্দ্রার স্বর্ণপদক লাভ, কিংবা ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে জয়লাভ দেশবাসীর জাতীয়তাবােধকে উদ্দীপ্ত করেছে।

সুতরাং খেলায় যারা অংশগ্রহণ করে অথবা দর্শক হিসাবে যারা খেলা দেখে খেলার প্রভাব কেবল তাদের মধ্যেই সীমিত নয়, বিস্তৃত হয় বর্ণসম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত দেশবাসীর উপর।

জাতীয় জীবনে খেলাধুলা

জাতীয় জীবনে খেলাধুলার বিশিষ্ট প্রভাব আছে ঠিকই কিন্তু সে প্রভাব যদি উপকারের পথে চালিত না হয়ে ভিন্ন পথে চালিত হয় তখন তার ক্ষতির পরিমাণও হয় ভয়াবহ।

যেমন, খেলাধুলায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ। রাজনীতির দুবৃত্তায়ন খেলাধুলাকেও করেছে কলঙ্কিত।  ক্রিকেটে কোন্ খেলােয়াড় প্রথম একাদশে খেলবে সেখানেও রাজনীতি প্রবেশ করেছে।

দল গঠনে গােষ্ঠীবাজীও চোখে পড়ছে যা মােটেই কাম্য নয়।

উপসংহার

খেলাধুলা মানুষকে শক্ত সমর্থ করে তােলে, মানুষকে জীবন সংগ্রামে জয়ী করে, তার চরিত্র গঠন করে। খেলাধুলা মানুষকে জাতীয়তাবােধে উদ্দীপ্ত করে।

সুতরাং নিয়মিত ও পরিমিত শরীরচর্চা সুথ জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। তাই জাতীয় জীবনে খেলাধুলার চর্চা হওয়া অবশ্য প্রয়ােজন। খেলাধুলায় জাতি শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে ওঠে।

মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে বাধা-বিপত্তিকে সরিয়ে জীবনকে উপভােগ করার মানসিকতা।

মােট কথা, কেবল পড়াশােনা করলে চলবে না। যদি কোনাে ছেলে বা মেয়ে শুধু খেলাধুলাই করে যায়, পাঠে মন না দেয়, সে যেমন নিন্দাহ। লেখাপড়া ও খেলাধুলা দুটি সমান ভাবে করা উচিত।