সহিষ্ণুতার মূল্য নিয়ে বাংলা অনুচ্ছেদ

ভূমিকা

বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘যে সয় সে রয়’। সহিষ্ণুতার কী মূল্য তা বােধহয় এই ছােট্ট প্রবাদটুকুর মধ্যে সম্পূর্ণ ধরা আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ ও একই কথা বলতেন। প্রবাদগুলি অভিজ্ঞতাভিত্তিক।

অতএব ভূয়ােদর্শন হতে পূর্বোক্ত যে-প্রবাদটির উদ্ভব হয়েছে তার যাথার্থ্য সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ অসমীচীন। একমাত্র বিবর্তনবাদের ইতিহাস অনুধাবন করলেই প্রবাদটি-যে সত্য তা বোঝা যায়।

প্রতিকূল অবস্থার সহিত সংগ্রাম করেই প্রাণী-জগৎকে আত্মরক্ষা করতে হয়েছে।  সহিষ্ণুতাই সকল প্রাণীর অস্তিত্বকে দীর্ঘায়ু দান করে।

আমরা কথায় বলি ধরিত্রীর মতাে সহিষ্ণু। কথাটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। জীবধাত্রী বসুন্ধরা কত বড়ঝড়ঝঞ্জা  আর পরিবর্তন বুকে বয়ে তার কর্তব্য করে যাচ্ছে, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

সহিষ্ণুতা : জাতির দৃঢ় বনিয়াদের ভিত্তি

মানুষের ইতিহাসও একই কথা বলে। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে বহু জাতির আবির্ভাব হয়েছে, বহু মতের অভ্যুত্থান ঘটেছে, আবার তাদের মধ্যে কত জাতি, কত মত কালগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

উহার পশ্চাতে যে-সকল কারণ বর্তমান, সহিষ্ণুতার অভাব তাহার অন্যতম। দুঃখ-বিপদকে যে-জাতি যত বেশী সহ্য করতে পেরেছে, কালের ইতিহাসে সেই জাতির বনিয়াদই তত বেশী স্থায়ী হয়েছে।

সহিষ্ণুতার স্বরূপ

সহিষ্ণুতা কথাটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ সহনশীলতা। অর্থাৎ সহ্য করার স্বভাব বা প্রবণতা। সেদিক থেকে ধৈর্য ও অধ্যবসায়, সহিষ্ণুতার প্রায় সমার্থকই বলা চলে। অন্যভাবে আরও বলা যায় ধৈর্য ও অধ্যবসায় সহিষ্ণুতারই সহােদর।

সহিষ্ণুতার আবশ্যকতা

এই সকল দৃষ্টান্ত আমাদেরকে নিয়তই সহিষ্ণুতার আবশ্যকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, দুঃখ সহ্য করে সংগ্রাম করতে হবে, যে সইতে পারবে না, সে রইতেও পারবে না ; তার ধ্বংস অনিবার্য।

প্রাত্যহিক জীবনে ও সমাজ জীবনে সহিষ্ণুতার প্রভাব

সহিষ্ণুতার গুণ-যে অপরিসীম, প্রাত্যহিক জীবনে এবং সমাজ-জীবনে আমরা প্রত্যহ তাহা দেখিতে পাই। সংসারে নানা কাজের সংঘাতে, দুঃখে-দৈন্যে, বিপদে- আপদে যখন আমরা পদে পদে আঘাত পাইতে থাকি।

তখন স্বভাবতঃই আমাদের চিত্ত বিক্ষিপ্ত ও চঞ্চল হইয়া উঠে, তখন আর আমরা আপনাদিগকে সংযত রাখিতে পারি না। কিন্তু বিক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ যতই ঘটুক না কেন, যিনি শান্তচিত্তে সেটি সহ্য করতে পারেন, তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে থাকেন।

অপরপক্ষে যিনি সেই বিক্ষোভের নিকট অসহায়ের মতাে আত্মসমর্পণ করেন, তার জীবনযাত্রা সকল সময়েই বিফল হয়। সহিষ্ণু ব্যক্তি শত ঝড়-ঝক্কায় অবিচলিত থাকেন বলেই সাফল্য তাঁর হাতের মুঠোয়। অধিকন্তু সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল ব্যক্তির ব্যক্তিত্বই তাকে সকল মানুষের প্রিয় করে তোলে।

সহিষ্ণুতার শক্তি

সহিষ্ণুতা দুঃখ কষ্ট জয়ের অমােঘ মন্ত্র। জীবন-সংসার হল সমরক্ষেত্র। সেখানে বাধাবিপত্তি আছে, দুঃখ-দৈন্য আছে, অপমান-লানা আছে। আছে আশা-নিরাশার আলােছায়া। ওই প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মানুষকে জীবননির্বাহ করতে হয়। সবসময় শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়ােগ করা চলে না।

ধৈর্য-সহিষ্ণুতায় বুক বেঁধে এগােতে হয়। ধৈর্য-সহিষ্ণুতা দুর্জয় আত্মশক্তিকে জাগ্রত করে। হৃদয়ের সুকোমল বৃত্তিগুলির বিকাশসাধন করে। সহনশক্তির দ্বারা শ্রীচৈতন্য মদ্যপ জগাই- মাধাইয়ের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছিলেন।

সহিষ্ণুতা পারিবারিক জীবনে শান্তির সহায়ক

সহিষ্ণুতা পারিবারিক জীবনে শান্তির সহায়ক। পরিবারের মানুষগুলির মধ্যে যদি বাইরের আঘাত সইবার ক্ষমতা না থাকে, যদি অপরের দোষ-ত্রুটিকে অগ্রান্ত করবার শক্তি না থাকে।

তবে পরিবারের মধ্যে সকল সময়েই মনান্তর ও মতান্তর ঘটতে থাকে, এবং তারই ফলে পারিবারিক সংহতি ভেঙে পড়ে। আমাদের যৌথ পরিবারগুলি-যে ক্রমশঃ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অসহিষ্ণুতাই তার অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রয়ােজনীয়তা

সহিষ্ণুতাই আমাদের অগ্রগতির সহায়ক। সহিষ্ণুতা আমাদের দেহে-মনে যে অমিতশক্তির জোগান দেয় ভবিষ্যতে তারই সুপ্রয়ােগে আমরা প্রতিষ্ঠা অর্জন করি। ব্যক্তিগত জীবনে বা সমাজগত জীবনে এমনকি জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা একান্ত দরকার। বলতে গেলে, আমাদের সুখ-শান্তি ও স্থৈর্য মূলত নির্ভর করে আছে সহিষ্ণুতার ওপর।

সহিষ্ণুতা চারিত্রশক্তির অন্যতম লক্ষণ

সহিষ্ণুতা চারিত্রশক্তির অন্যতম লক্ষণ। দুর্বলচিত্ত মানুষ কখনও সহিষ্ণু হতে পারে না। কারণে-অকারণে সময়ে-অসময়ে সে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং অশান্তিকে ডাকে আনে। যারা দৃঢ়চিত্ত তারাই সহিষ্ণু হয়ে থাকেন।

শুধু তাই নয়, সহিষ্ণুতা একটি মানবিক গুণও বটে। অপরের প্রতি প্রীতি না থাকলে, সহানুভূতি ও সমবেদনা না থাকলে মানুষ সহিষ্ণু হতে পারে না। ইতিহাসের সকল সহিষ্ণু পুরুষ এবং নারীই এইরূপ মানবিকতায় উজ্জীবিত।

সহিষ্ণুতার অভাবে

পারিবারিক ক্ষেত্রে আমরা দেখি ভাইদের মধ্যে কেউ অসহিষ্ণু হলে ভাঙন ধরে সংসারে। এই অসহিষ্ণুতার জন্যই মা বাবা, ভাই-বােন, বন্ধু- বান্ধব সকলের মধ্যেই বিবাদ-বিসংবাদের সৃষ্টি হয়।

খেলার মাঠে অসহিষ্ণু হলে ভালো খেলােয়াড়ের খেলাও পড়ে যায়। খেলার যিনি পরিচালক তাঁর কোনাে সিদ্ধান্তে খেলােয়াড়রা অসহিষ্ণু হয়ে উঠলে খুব ভালাে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মর্যাদাও তাে নষ্ট হয়।

সহিষ্ণুতার সাধনা

চেষ্টার অসাধ্য কিছুই নয়। আমরা যদি বিশ্বাস করি যে, সহিষ্ণুতা দুর্বলতার নামান্তর নয়, বরং সবলতা সাধনার একটি বলিষ্ঠ অঙ্গ-তা অযথার্থ হবে না। এই সগুণ চর্চার সম্ভাব্য পথটির সন্ধানও আমরা তৎক্ষণাৎ পেয়ে যাব।

সহিষ্ণুতা অনুশীলনসাপেক্ষ

সকল বৃত্তির মতােই সহিষ্ণুতাও চর্চাসাপেক্ষ। অনুশীলন দ্বারা এই বৃত্তিটিকে আমরা সবল করে তুলতে পারি। ছাত্রজীবন হতেই এইরূপ অনুশীলন আরম্ভ করা প্রয়ােজন। এই সময়েই ঐ সদ্গুণটিকে অঙ্কুরিত করতে পারলে ভবিষ্যতে তারাই পল্লবচ্ছায়া বৃহত্তর পরিধিতে শান্তি বিস্তারে সক্ষম হবে।

উপসংহার

মানুষ সামাজিক জীব। সকলের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজে বাস করতে হয়। পারস্পরিক সহযােগিতা, পরমত গ্রহণের উদার সহিষ্ণুতা একান্ত দরকার।

সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহ যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে শান্তির সংযত উদার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। আর সেই শান্তির মধ্যে মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও সুখ-সমৃদ্ধি নিহিত।