সমাজ জীবনে মেলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

ভূমিকা

মেলা হল মিলনের ক্ষেত্র, এই মিলন সংস্কৃতির আদান-প্রদানের, ‘দিবে আর নিবে, মেলাবে মিলিবে’-র। সুতরাং সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে মেলার বিকল্প খুব কমই আছে।

উৎস

গ্রামপ্রধান ভারতবর্ষে মানুষের মধ্যে ছিল সংকীর্ণতা। সেই নিরিখে বিচার করলে সংকীর্ণতাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে মেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য হয়ে উঠল।

মানুষ যদি দিনের পর দিন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে জীবন কাটায় তাহলে তার হৃদয় প্রসারিত হয় না, আর তা না হলে জন্ম নেয় কূপমণ্ডুকতা ও সংস্কারাচ্ছন্নতা।

তাই সংস্কার ও কূপমণ্ডুকতা দূর করতে গ্রামে গ্রামে কোনাে উৎসব উপলক্ষে মেলা অপরিহার্য হয়ে উঠল।

সমাজ জীবনে মেলার প্রয়োজনীয়তা

লক্ষ্য

মেলা যেহেতু মানুষে-মানুষে মিলনের ক্ষেত্র তাই সমাজ বন্ধনের দিক থেকে মেলার গুরুত্ব অপরিসীম।

“এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্মৃত হয়-তাহার হৃদয় খুলে দান করার ও গ্রহণ করার এই প্রধান উপলক্ষ।

যেমন আকাশের জলে জলাশয় পূর্ণ করার সময় বর্ষাগম, তেমনি বিশ্বের ভারে পল্লীর হৃদয়কে ভরে দেওয়ার উপয়ক অবসর মেলা।”

উদ্দেশ্য

রবীন্দ্রনাথ মেলার উদ্দেশ্য ও স্থান-কাল সম্বন্ধে জানিয়ে লিখেছেন, “একটা সভা উপলক্ষে যদি দেশের লােককে ডাক দাও, তবে তাহারা সংশয় নিয়ে আসবে, তাদের মন খুলতে অনেক দেরি হবে- কিন্তু মেলা উপলক্ষে যারা একত্র হয় তারা সহজেই হৃদয় খুলেই আসে- সুতরাং এইখানেই দেশের মন পাবার প্রকৃত অবকাশ ঘটে।

পল্লীগুলি যেদিন হাল-লাঙল বন্ধ করে ছুটি নিয়েছে, সেইদিনই তাদের কাছে এসে বসবার দিন।”

সুতরাং মানুষের মধ্যে পরস্পর ভাব বিনিময় ও আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হল মেলা এবং তা কৃষিভিত্তিক ভারতবর্ষে কৃষিকাজের বিশ্রামের সময় সংঘটিত হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

Read More:  রচনা লেখ : আমার একটি প্রিয় শখ (ফটোগ্রাফি)

প্রয়োজনীয়তা

সমাজজীবনের অস্তিত্ব মানুষে-মানুষে সম্পর্ক বন্ধনের গভীরতায়। সেই বন্ধন যথার্থ ও দৃঢ় করতে মেলার বিকল্প নেই।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সবকিছু কষ্ট ভুলে একত্রিত হওয়া ও পরস্পর আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে উদ্দীপিত করা যায় মেলার মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, মেলা সমাজ ও সংস্কৃতির গতিশীলতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য উপাদান। কেননা পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার সুযােগ ও সম্ভাবনার ক্ষেত্র রচিত হয় মেলায়।

চতুর্থত, বদ্ধ জল, বােবা কান্না যেমন উন্নতির প্রতিবন্ধক তেমনি সমাজের সংকীর্ণতা ও কূপমণ্ডুকতাও প্রগতির অন্তরায়। সেক্ষেত্রে মেলা-ই পারে উদার পটভূমিতে সংকীর্ণতা ও কূপমণ্ডুকতা দূর করতে।

পঞ্চমত, মানুষ প্রতিদিনের নিত্য-নৈমিত্তিক কাজের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠে, সেই বদ্ধতা থেকে মেলা মুক্তির আনন্দযজ্ঞে মানুষকে নিমন্ত্রণ জানায়।

মানুষের ক্ষুদ্রতা, অহংকার দূরীভূত হয়ে মানুষ নিখিল বিশ্বে মুক্তির স্বপ্ন দেখতে পারে এই মেলার মাধ্যমে।

ষষ্ঠত, আমাদের দেশে মেলাগুলির মাধ্যমে চিরকাল আনন্দ উৎসবের সূত্রে লােককে সাহিত্যরস ও শিক্ষা দান করে আসছে।

বিশেষ করে বিভিন্ন মেলায় যাত্রা, কীর্তন, কথকতা, ম্যাজিক প্রভৃতির মাধ্যমে গ্রামের মানুষ আনন্দ পেয়ে আসছে। তাই আনন্দদানের ক্ষেত্রে মেলার ভূমিকা যথেষ্ট।

বিশ্বায়ন ও মেলা

সর্বোপরি, বিশ্বায়নের পর যেখানে বাজার অর্থনীতির রমরমা সেখানে মেলার বাণিজ্যিক দিকটিকে অস্বীকার করা যায় না। তাই বর্তমানে মেলা হল ক্রেতা টানবার একটা প্লাটফর্ম।

প্রত্যন্ত গ্রামেও ভিন্ন ভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষে কিংবা সাংস্কৃতিক প্রয়ােজনে মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলাকে আকর্ষণীয় করে তােলার জন্য বিনােদনের উপকরণও সুসজ্জিত রাখা হচ্ছে।

শুধু মিলনের জন্য নয় বা ভেদাভেদ-জাতপাত ভুলে একত্র মিলিত হওয়ার কারণেও নয়, মেলা হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক লেনদেনের এক ক্ষেত্র। অর্থনীতিতে বাজার ও প্রতিযােগিতা যেখানে শেষ কথা সেখানে মেলা সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রতিযােগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে।

এর দ্বারা হয়তাে সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, বিশ্বাস-সংস্কারগুলি ভেঙে যাচ্ছে কিন্তু তার পরিবর্তে আসছে নতুন চিন্তা-ভাবনা ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তা সর্বাংশে আমাদের সমাজের উপযােগী না হলেও সমাজের বহুদিনের সংকীর্ণতাকে যে দূর করতে পারছে, তা বলাবাহুল্য।

Read More:  তোমার প্রিয় বাংলা ভাষার লেখক - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা

গ্রামের মেলার চিত্র

এ বছর রথের দিনে সকাল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মন খারাপ সকলের। বাবার কাছে বায়না ধরে টাকা নিয়েছি। মাও দিয়েছেন। অনেক কিছু কিনব। নাগরদোলায় চাপব। পুতুল-শাে দেখব।

সারি সারি দোকানপাট। কত লােভনীয় খাবার। গ্রামের ময়রার তৈরি। টাটকা, দেশি। হঠাৎই মেঘ কেটে ঝকঝকে রােদ। হইহই করে বন্ধুরা চলে এল। তাদের সঙ্গে ছুটলুম।

রথে টান পড়লাম থামলুম সেখানে, যেখানে বর্ণাঢ্য রথ একঠায় দাঁড়িয়ে। জরিতে মােড়া। ফুলে ফুলে রঙিন। রঙিন কাপড়ে জড়ানাে। রথের গর্ভে তিন মূর্তি- প্রশান্ত, প্রফুল্ল, স্মিত মুখ।

রশিতে হাত পড়ল সমবেত জনতার। রথ এগিয়ে চলল। ওপরে পুরােহিত। হাতে চামর। পায়ে পায়ে এগিয়ে চললুম।

রথের মাঠের বর্ণনা

রথের রশিতে হাত ছুইয়ে এলুম মেলার মাঠে। ছিটকে যাওয়া বন্ধুরা এক এক করে জড়াে হল। সামনে নাগরদোলা। সাপুড়ের বাঁশি ও পুতুল নাচ। অঢেল দিশি মিঠাই-এর সুবাসে ভরে আছে বাতাস।

গনগনে উনুনে প্যাচে প্যাচে রসময় জিলিপি, ছানাবড়া আর কদমা। পাঁপরের খসখসে আওয়াজ। ঘ্রাণ নিই। স্বাদ নিই প্রাণভরে।

ফল বিক্রয়

আষাঢ় মাসটা হল আম-কাঁঠালের মাস। দূরদূরান্ত থেকে বহু লােক আসেন আম- কাঁঠাল সওদা নিয়ে।

এঁদের আম-কাঁঠাল-লিচু প্রচুর বিক্রি হয়। বিক্রি হয় আলু- পটল-উচ্ছে-ঝিঙেসহ নানান ধরনের শাকসবজি। এ মেলায় ইদানীং মাছের স্টলও দেখা যায়।

মনিহারি দোকান

তবে মেলার সবচেয়ে আকর্ষক বিষয় হল মনিহারি দোকানগুলাে। কাচের চুড়ি, পেতলের আংটি, খেলনা, দম দেওয়া মােটরগাড়িসহ বহু মনােহারি সামগ্রী দেখা যায় এইসব দোকানে।

গত বছর এইরকম একটি দোকান থেকে আমি একটি সুন্দর খেলনা কিনেছিলাম।

নাগরদোলা ও পুতুল নাচ

আমাদের রথের মেলার আরও আকর্ষণ আছে। আমাদের অন্যতম আকর্ষণ নাগরদোলা। আমাদের রথের মেলায় প্রতি বছর আসে নাগরদোলা। পুতুলনাচ হল আমাদের মেলার আর-একটি বিশেষ আকর্ষক ব্যাপার। মেলার সময় প্রতি রাতে পুতুলনাচ হয়।

রাত্তির দশটা এগারােটা পর্যন্ত চলে এই পুতুলনাচ। আমাদের দেখা এই বিশেষ মেলাটি হল সত্যি সত্যিই মিলনের একটি মেলা।

Read More:  একটি নির্জন দুপুরের স্মৃতি নিয়ে প্রবন্ধ লেখ

সবার সঙ্গে আনন্দ

বন্ধুদের সঙ্গে চাপলুম নাগরদোলায়। অনেক বারই তাে চেপেছি। তবু প্রত্যেকবারই নতুন। পাখির মতাে হালকা লাগে। কচিকাঁচাদের দৌরাত্মে ব্যতিব্যস্ত বাবা-মা।

অভিমানী কিশাের-কিশােরী। দু-চোখ ভরে দেখছি, অজানা পুলকে ভরে উঠছে  মন। মনে হল এ মেলা নয়, এ যেন তীর্থক্ষেত্র। মানুষের সমস্ত আনন্দকে শুষে নিলুম।

উপসংহার

বনের পশুর কাছ থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে মানুষ জীবন ও জীবিকার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মানুষ যখন বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে জানার ও অপরকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করল তখন তারা বুঝতে পারল তাদের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে রয়েছে গলদ।

এই জানা বা উপলব্ধির ক্ষেত্রে মেলা ছিল অন্যতম মাধ্যম। তবে বর্তমানে এই কৃত্রিম স্বার্থসর্বস্ব সমাজে সবকিছুই অর্থের মানদণ্ডে যাচাই করা হয়, মেলাও তার ব্যতিক্রম নয়।

তাই পুনরায় মেলাগুলিকে সংস্কারের প্রয়ােজন দেখা দিয়েছে, অন্তত সুস্থ সমাজ-ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়ােজনে।