সবার উপরে মানুষ সত্য রচনা

সূচনা

কথিত আছে, ‘আব্রয় স্তম্বপর্যন্তং’ অর্থাৎ তৃণে পর্যন্ত ব্রয়ের অধিষ্ঠান। সর্বশাস্ত্রবিদ সত্যদ্রষ্টারা বলেছেন, চেতন-অচেতন নির্বিশেষে সর্বত্র তিনি বিরাজিত, তবে মানুষের মধ্যেই তার প্রকাশ সবচেয়ে বেশি। লীলাময় করুণাঘন নিখিল মানবজীবন প্রবাহের মধ্য দিয়ে নিজেকে নিত্য নব নব রূপে আস্বাদন করছেন।

জীবকুলের মধ্যে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষ ঈশ্বরের মহত্তম সৃষ্টি। বাহুবলে, জ্ঞান-বুদ্ধিতে, কর্মকুশলতায় মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। অতএব, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’-এ শুধু কথার কথা নয়, বিশ্ব-বিধানের এক শাশ্বত সত্য।

সবার উপরে মানুষ সত্য রচনা

মানুষ জাতি

পৃথিবীতে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, মিসিসিপি থেকে গঙ্গা নদী পর্যন্ত অজস্র বৈচিত্র্যের মধ্যে মানুষ বিরাজমান। বাইরের আকারে, পােশাক-পরিচ্ছদে, রাষ্ট্রীয় সীমানার বাধ্যবাধকতায়, ভৌগােলিক সীমা বেষ্টনের যুক্তিতে কিংবা সাদা-কালাে-হলুদ গায়ের রঙের ভিত্তিতে তার নাম-নামান্তর।

একই বিশ্বপিতার আমন্ত্রণে সকলে এসেছে নীল আকাশের নীচে, মাটির আঙিনায়, একই জলে বাতাসে লালিত সকলে। বিশ্বজননীর সন্তান সবাই। প্রত্যেকের ধমনীতে বইছে একই রক্তপ্রবাহ। তাঁর সৃষ্টিতে নেই কোনাে ভেদাভেদ, নেই কোনাে রকম পার্থক্য।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও সবাই মানুষ, অন্তরের মনুষ্যত্বের আদর্শে সবাই এক। সারা বিশ্বজুড়ে মানুষের একটি স্থানীয় ও চিরকালীন পরিচয়, সে মানুষ জাতি-জগৎ জুড়িয়া একটি জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি। তাই বাইরের ভেদাভেদ তুচ্ছ করে মনুষ্যত্বের অপরাজেয় মহিমায় ও মানবিকতার সার্থক বিকাশে তার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত।

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে মানুষ ; উষালগ্ন

মানুষের হৃদয়জ সম্পদই তার সভ্যতা বিকাশের নেপথ্য শক্তি। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ যখন বনে-প্রান্তরে, তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উপকূলভূমিতে, পর্বত গুহায় বিচরণ করতে শুরু করেছে, সেদিন পৃথিবীকে মানুষের বাসযােগ্য ভূমি করে তােলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষ মানুষকে আলিঙ্গন করেছে সখারূপে, বন্ধুরূপে। মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম ভালােবাসাকে অবলম্বন করেই শুরু হয় মানব-সভ্যতার ঊষাকালে মানুষের জয়যাত্রা।

আমরা সব মানুষ এক

মানুষ এক, মানুষে-মানুষে কোনাে বিভেদ নেই, সকল মানুষই সমান, ভারতবর্ষ এই মহান সত্য আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু বৈদিক যুগের অবসানে মনুষ্যত্বের সেই মহিমা অনেকটা কমে যায়।

বিভেদ সৃষ্টির কারণ

বর্তমান মানবসমাজে  বিভেদ সৃষ্টির প্রধান কারণ হল উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ বিভেদ সৃষ্টির কারণ এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের উপর অত্যাচার। জাতীয়তাবাদ প্রাথমিক ভাবে জরুরি। জন্মভূমির প্রতি আমাদের মায়া-মমতা, আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক-এ থেকেই গড়ে ওঠে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

ভােগসর্বস্ব ও বিষয়মুখী জীবনযাত্রা

ভােগসর্বস্ব ও বিষয়মুখী জীবনযাত্রা মনুষ্যত্ব বিকাশের পরিপন্থী। তা মানুষের অন্তর্নিহিত সত্যকে আবৃত করে রাখে। ফলে, অতি কাছের মানুষেরও প্রকৃত পরিচয় আমরা পাই না।

যে মানুষ যান্ত্রিক, সম্পদ আহরণকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করে, সে মানুষের প্রতি যেমন বিশ্বাস হারায়, প্রকৃতি থেকেও ঠিক তেমনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলে সুখী হয়।

মানুষের সংগ্রামী ভূমিকা

আদি যুগের অসহায় মানুষ অপরিসীম চেষ্টায় প্রকৃতিকে বশে এনেছে, যে একাগ্র সাধনায় জড় জগতের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে, জগৎ-সংসারের অগ্রগতির ইতিহাসে তা বিস্ময়কর। মানুষ যেখানে অজানাকে জেনে, জড় প্রকৃতির মধ্যে নিয়মের সূত্র আবিষ্কার করে খুশি, সেখানে তার কৌতূহল, ত্যাগ ও তিতিক্ষা নিশ্চয়ই প্রশংসার যােগ্য।

মহাপ্রাণদের বাণী ও সাধনা

মহাপ্রাণরা যুগে যুগে মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও চৈতন্যকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। যিশুখ্রিস্ট বলতেন, সবাই আমরা পরম-পিতার সন্তান। সবাই আমরা এক ও অভিন্ন। হজরত মহম্মদ এবং গৌতম বুদ্ধের কাছেও আপন-পর ভেদ ছিল শ্রীচৈতন্য চণ্ডলকে জড়িয়ে ধরতেন, কৃষপ্রেমে মাতােয়ারা হয়ে উদ্ভিদকেও আলিঙ্গন করতেন।

স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ‘পরােপকারে নিজেরই উপকার’। রামকৃষ্ণু পরমহংসদেবও বলতেন, মানুষের মধ্যেই তার শক্তির প্রকাশ সবচেয়ে বেশি। মানবমৈত্রী পারস্পরিক সহযােগিতা এবং একই পৃথিবীর সন্তান-এই দৃষ্টিভঙ্গি পৃথিবী থেকে যুদ্ধের ভয় মুছে দিতে পারে। দিবে আর নিবে/মিলাবে মিলিবে’-এই আদর্শই পৃথিবীকে এক সুখের আগারে পরিণত করবে।

মানব বন্দনায় কবি

মানব বন্দনায় দেশ-বিদেশের সাহিত্য মুখরিত। মনসামঙ্গলের কবিও মানুষ চাঁদ সওদাগরের মহিমাকে বড়াে করে দেখিয়েছেন। নতুন যুগের মানবতাবাদ উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে আমাদের দেশের বহু লেখক-শিল্পী ও মনীষীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

উপসংহার

মানুষ অমৃতের পুত্র। মানুষের মাঝে বিরাজ করছেন মানুষের প্রাণের দেবতা পরমেশ্বর। তারা একই পরম পিতার সন্তান। একই স্রষ্টার জল-আলাে-হাওয়ার সঞ্জীবনী সুধায় তারা লালিত-পালিত, একই পরম পুরুষের আসনখানি তাদের হৃদয়ে পাতা।

তাই ‘যত্র জীব তত্র শিব’। জীব সেবাই শিব সেবা। মানুষের প্রেম-প্রীতি-ভালােবাসাই পূজার অর্ঘ্য। হৃদ্ধর্মের অমূল্য রত্নের অধিকারী একমাত্র মানুষই। সে জন্যই তাে যে কোনাে মানবপ্রেমিক মহাত্মা মানবতার জয়গানে মুখর। তাই যুগ-যুগান্তর ধরে সবার ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত।