সংবাদপত্র পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

ভূমিকা

সংবাদ-পরিবেশক পত্রই সংবাদপত্র। দেশকে জানা এবং নিজেকে জানার জন্য সংবাদপত্র পাঠের প্রয়ােজনীয়তা যথেষ্ট। আধুনিক জীবনযাত্রায় সংবাদপত্র অতিশক্তিশালী গণমাধ্যম।

ভাের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র সমস্ত পৃথিবীকে চোখের সামনে এনে দেয়।

আধুনিক মানুষ যত নিজেকে অপরের কাছে মেলে ধরতে চেয়েছে এবং নিজের সঙ্গে অপরের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উপলব্ধি করতে তৎপর হয়েছে ততই সংবাদপত্র সেই প্রকাশের ও উপলব্ধির সহায়ক উপকরণ রূপে উপস্থিত হয়েছে।

সংবাদপত্র পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

সংকীর্ণ জীবনের গণ্ডি থেকে সংবাদপত্র মানুষকে মুক্তি দিয়ে তাকে বৃহত্তর জগতে নিয়ে যায়।

সুতরাং যে কোন আধুনিক মানুষের কাছে সংবাদপত্র যে তার মনের খােরাক জোগাতে পারে-সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

সংবাদপত্রের ভূমিকা ও বিষয়বস্তু

আধুনিক যুগের চাহিদাতেই সংবাদপত্রের আবির্ভাব। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার সংবাদপত্রের বহুল প্রচারকে ত্বরান্বিত করেছে।

বিশেষ করে আমাদের মতাে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্র মানুষের জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে বলেই তার পাঠের প্রয়ােজনীয়তা অনস্বীকার্য।

সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টিতে সংবাদপত্র এক বিশিষ্ট মাধ্যম।

এমনকি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ও জাতীয়তাবােধের জাগরণে সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অসাধারণ।

আধুনিক সংবাদপত্রের ভূমিকা শুধু সংবাদ পরিবেশনে সীমাবদ্ধ নয়।

আধুনিক সংবাদপত্র সমাজ ও জীবনের সব কিছুই পরিবেশন করে।

শিল্প সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, খেলাধুলা ইত্যাদি বহুবিধ জিনিসের আলােচনায় আধুনিক সংবাদপত্র সমৃদ্ধ।

এ ছাড়া রাজনৈতিক ঘটনাবলি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কোনাে রােমাঞকর অভিযান, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারি প্রভৃতির বৃত্তান্ত সংবাদপত্রে স্থান পায়।

Read More:  বইমেলায় একটি সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা রচনা লেখ

এমনকি শ্রমিক সমস্যা, ছাত্র সমস্যা, ব্যাবসাবাণিজ্য, আমােদ-প্রমােদ, চুরি-ডাকাতি, কর্মখালি, পাত্রপাত্রী, ধর্মীয় ব্যাপার, বাজার-দর ইত্যাদি নানা কর্মকাণ্ডের কথা সংবাদপত্রের মাধ্যমেই মানুষ জানতে পারে।

সংবাদপত্রের উদ্ভব ও বিকাশ

চিনদেশে সর্বপ্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। মুদ্রান্ত্রের আবিষ্কারের আগে ভারতবর্ষে শাজাহানের সময় ‘আইন-ই-আকবরি’ নামে হাতে লেখা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। তারপর ইউরােপের ইটালিতে সংবাদপত্রের প্রকাশ ঘটে।

এর পর মুদ্রাযন্ত্রের আবিষ্কারের দৌলতে সংবাদপত্র চারদিকে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে।

ভারতীয় সংবাদপত্রের প্রাথমিক ইতিহাস

১৭৮০ সালের ২৯শে জানুয়ারি ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্রের সূচনা। তার পর একে একে ‘বেঙ্গল গেজেট, ইন্ডিয়া গেজেট’, ও ক্যালকাটা গেজেট প্রকাশিত হয়।

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র হল সমাচার দর্পণ। এরপর ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’, সংবাদ প্রভাকর’ প্রভৃতি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল।

গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র

সেই সময়ে সংবাদপত্র শুধু খবর জুগিয়ে নয়, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে মানুষের মনে স্বাধীনতা বােধ জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। আধুনিক যুগে গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের গুরুত্ব আজ সর্বস্তরে প্রসারিত।

শুধু শহর নয়, সুদূর গ্রামেও কোন চা-এর দোকানে সংবাদপত্র পাঠের জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে ওঠে। রাজনীতি থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সব শ্রেণির সংবাদ, সংবাদপত্র থেকে মানুষ গ্রহণ করে নিজেদেরকে আলােকিত করে।

রাজনীতি, খেলাধুলা, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান প্রভৃতি যাবতীয় খবর পাওয়ার জন্য সংবাদপত্র পাঠের প্রয়ােজনীয়তা যথেষ্ট।

দেশবিদেশের নানান খবরের আলােকে আধুনিক মানুষ নিজেকে উদ্দীপিত করতে পারে এবং তা সম্ভব সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে।

শুধু শিক্ষার জন্য নয়, জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সংবাদপত্র পাঠ একান্ত জরুরি।

দৈনিক সংবাদপত্র

প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও একজন সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন সংবাদপত্র পড়ে পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। তাছাড়া সংবাদপত্রের মূল উদ্দেশ্য হল মানুষকে।

বিভিন্ন তথ্য প্রদান করা, জনমত গঠন করা, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, ন্যায়-অন্যায়বােধ জাগ্রত করা প্রভৃতি। সেদিক থেকে একজন আধুনিক মানুষকে সাহায্য করতে পারে সংবাদপত্র।

Read More:  শারীরিক ব্যায়াম নিয়ে প্রবন্ধ রচনা লেখ

নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের উপযোগিতা

নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করার একটি নয় একাধিক উপকার আছে। ছোট বেলা থেকেই প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীদের সংবাদ পত্র নিয়ে সংবাদ পাঠ করা উচিত। আমাদের ভারতবর্ষে প্রত্যেকটি ভাষায় আলদাদা আলাদা সংবাদপত্র পাওয়া যায়।

একজন ছাত্র তথা পড়ুয়া যদি প্রত্যেকদিন খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস শুরু করে তাহলে তার অনেক শিক্ষা বাড়বে এবং অনেক নতুন কিছু শিখতে পারবে।

শুধু তাই নয় এই অভ্যাস নিয়মিত চালাতে থাকলে নিজের অনেক উন্নতি হবে।

আচ্ছা, অনেকে আবার বলে যে ইংরেজিতে কিভাবে কথা বলা শেখা যেতে পারে সহজে। আমি তো বলব তারা যেন অবশ্যই ইংরেজিতে সংবাদপত্র পড়া শুরু করে।

কারণ ইংরেজি খবরের কাগজ পড়লে অনেক নতুন অজানা শব্দ শেখ যায়। সেই শব্দটির মানে বুঝতে না পারলে গুগল-এ সার্চ করে নিতে পারেন।

সব দিক থেকে বলতে গেলে সংবাদপত্র পাঠ অনেক উপকারী। তবে সঙবাদ পত্র পথ করার সময়ে কোনো রকমের ভুল বা বিভ্রান্তিকর খবরের থেকে দূরে থাকা উচিত।

পড়ুয়াদের কাছে সংবাদপত্র

শিক্ষার্থীদের কাছে, সাধারণ স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের কাছে সংবাদপত্র বিশেষ আকর্ষণ।

পাঠ্য বহির্ভুত কোন খবর জানতে, পাঠের একঘেয়েমি দূর করতে, সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে, নান্দনিক বােধের ভাণ্ডার গড়ে তুলতে, নিজস্ব চেতনার বিস্তার ঘটাতে, পাঠে মনােনিবেশ আনতে শিক্ষার্থীদের কাছে সংবাদপত্র পাঠ একান্ত জরুরি।

বিশেষ করে আজকাল কোন কোন সংবাদপত্রে পাঠ্যপুস্তক সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যাদি ও প্রশ্নোত্তরের যে সব কলম থাকে তাতে শিক্ষার্থীরা যে বিশেষ উপকৃত হয় সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

বিভিন্ন সংবাদপত্র

ভারতবর্ষে বহু সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, যেমন-আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল, প্রতিদিন, স্টেটসম্যান, টেলিগ্রাফ, বর্তমান, সার্চলাইট, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দি হিন্দু, আসাম ট্রিবিউন ইত্যাদি। গণশক্তি, লােকমত ইত্যাদি দলীয় সংবাদপত্র।

সৃজনধর্মী বিকাশে সংবাদপত্র

সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে যে কোন মানুষ তার নিজস্ব মত প্রকাশ করার জন্য সম্পাদক সমীপেষু কলমে তার মতামত লিখে জানাতে পারেন।

Read More:  একটি বেকার যুবকের আত্মকথা রচনা

তাই সংবাদপত্র সেদিক থেকেও মানুষের সৃজনী শক্তি ও প্রতিভাকে উন্মােষিত করতে সাহায্য করতে পারে। এই সৃজনধর্মিতার বিকাশে সংবাদপত্র পাঠ যে জরুরি, সে বিষয়ে কেউ ভিন্ন মত পােষণ করেন না।

সংবাদপত্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য

  • বিভিন্ন দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন
সংবাদপত্র দেশ-বিদেশের মানুষকে কাছাকাছি আনে। এক রাজ্যের মানুষ অন্য রাজ্যবাসীর সঙ্গে একাত্ম হয়। ফলে মানুষের মধ্যে, দেশের মধ্যে, সেতুবন্ধন রচিত হয়।

 

  • জনমত গঠনে সংবাদপত্র
ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের রুিদ্ধে সংবাদপত্র গর্জে ওঠে। এককথায় তা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েওঠে।

 

  • সমাজমানসের দর্পণ
সংবাদপত্র জাতীয় জীবনের দর্পণ। জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, তার ধ্যানধারণা, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সংবাদপত্রে ঘটে।
  • গ্রন্থকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিপূরক হিসেবে কাজ
স্কুল কলেজের অধীত জ্ঞানের পাশাপাশি যদি একজন পড়ুয়া সংবাদপত্র পড়ে, তাহলে জ্ঞানের ভাণ্ডার অনেকটাই বেড়ে যায়।
তার ভাষা-জ্ঞান বাড়ে, চিত্তের বিকাশ ঘটে, তার চিত্ত বিশাল হয়।

নেতিবাচক দিক

একথাও ঠিক যে, আজকাল সংবাদপত্রে যেসব নেতিবাচক দিক অর্থাৎ খুন-জখম, দুবৃত্তায়ন, রাজনীতির উত্তপ্ত আবহাওয়া প্রভৃতি প্রকাশিত হচ্ছে তাতে সংবাদপত্র তার পুরােনাে সার্বিক গুরুত্বকে হারাচ্ছে তা বলাবাহুল্য।

তবুও সংবাদপত্রের সেই ব্যবসায়িক দিক বাদ দিলে তার পাঠের গুরুত্ব যে অপরিসীম–সেকথা সকলেই স্বীকার করবেন।

উপসংহার

শ্রীরামকৃয় নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘােষকে বলেছিলেন- “থিয়েটারে লােকশিক্ষা হয়”।

সেকথাকে একটু পরিবর্তন করে বলা যায়, সংবাদপত্র পাঠে লােকশিক্ষা হয়।

তাই সংবাদপত্র পাঠ আজকের দিনে যে কোন মানুষের কাছে জরুরি হয়ে পড়েছে। সেজন্য সুদূর গ্রামাঞ্চলেও মানুষ ঘুম ভেঙে খবরের কাগজে চোখ রাখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

আবার অবসর বিনােদনের জন্যও সংবাদপত্র এক অনন্য মাধ্যম রূপে পরিগণিত হয়েছে।

সুতরাং জনমত গঠনে, মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশে, সৃজনীশক্তির উদ্ভাবনে, অবসর বিনােদনে এবং নিজেকে ও অপরকে জানতে, ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’ নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে সংবাদপত্র পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।