সংখ্যাবাচক ও পূৰ্ণবাচক শব্দ গঠনের নিয়ম কি?

গণনার প্রয়ােজনে আমাদের দরকার হয় সংখ্যার। এই সংখ্যা অনেক। গণনা করতে বসলে দেখা যায়, আমরা অনায়াসেই এক দুই ছাড়িয়ে কোটিতে পর্যন্ত পৌঁছে যাই। সংখ্যা অফুরন্ত।

তা সংখ্যার অঙ্ক যতই অফুরন্ত হােক না কেন, তাকে প্রকাশ করা হয় কিন্তু শব্দ দিয়েই। শব্দই চিনিয়ে দেয় সংখ্যার হিসেব। তবে যে-কোনাে শব্দই কিন্তু সংখ্যা চেনাতে সক্ষম নয়।

ওই সংখ্যা চেনাবার জন্য যেসব শব্দ রয়েছে, তারাই শুধু হল সংখ্যাবাচক শব্দ।

সংখ্যাবাচক শব্দের সংজ্ঞা কী?

বৈয়াকরণরা বলেছেন, যে পদ বা শব্দের সাহায্যে গণনাযােগ্য বস্তুর সংখ্যা নির্দেশ করা যায়, তাকেই বলা হয় সংখ্যাবাচক শব্দ।

যেমন: এক, দুই, পাঁচ, সাত, দশ, পনেরাে, কুড়ি, একশাে, পাঁচশাে, হাজার, লক্ষ, কোটি ইত্যাদি। প্রাণী, বস্তু, বিষয় ইত্যাদিগকে গণনার মধ্যে আনতে হলে সংখ্যাবাচক শব্দ অবশ্যই ব্যবহার করতে হয়।

লক্ষ করে দেখা গেছে, বাংলায় সংখ্যাবাচক সব শব্দগুলােই বিশেষণ। যেমন : দশ বছর। কুড়ি টাকা। একশাে গাছ। এগারাে মাস। তিরিশ দিন। চোদ্দোশ সাল ইত্যাদি।

এখানে বছর, টাকা, গাছ, মাস, দিন ও সালের সংখ্যা গণনার জন্য বিশেষণ হিসেবে সংখ্যাবাচক শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এই শব্দগুলাের দ্বারা গণনার কাজ নির্বিঘ্নে চলছে।

কিন্তু সংখ্যার ক্রম বােঝাতে গেলে ওই সংখ্যাবাচক শব্দ দিয়ে ক্রম বােঝানাে যায় না, দরকার হয় ক্রমবাচক শব্দের। এই ক্রমবাচক শব্দের আর-এক নাম হল পূরণবাচক শব্দ।

এক, দুই, তিন, চার ইত্যাদি হল সংখ্যাবাচক শব্দ। কিন্তু যখনই এদের ক্রম বােঝানাে হবে, তখনই আমরা বলব প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি। ওই শব্দগুলােই ক্রমবাচক বা পূরণবাচক শব্দ।

সংজ্ঞা নির্দেশ করে বলা যায়, যে শব্দের দ্বারা গণনাযােগ্য বস্তু বা বিষয়ের কোনাে সংখ্যা নির্দেশিত না হয়ে, তার নির্দিষ্ট ক্রমকে বােঝায়, ওই শব্দটিকেই আমরা চিহ্নিত করি পূরণবাচক শব্দ বা ক্রমবাচক বা ক্রমাঙ্ক শব্দ বলে।

Read More:  বইমেলায় একটি সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা রচনা লেখ

যেমন: রমেশ তাদের ক্লাসের প্রথম স্থানাধিকারী। বাংলার ফুটবল টিমে মােহনবাগান এখনাে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, প্রথমে রয়েছে ইস্টবেঙ্গল, তৃতীয় মহমেডান দল।

সংখ্যা বাচক শব্দ তৈরি

সংখ্যাবাচক শব্দগুলাে আমরা মূলত গ্রহণ করেছি সংস্কৃত ভাষা থেকে। সংখ্যাবাচক শব্দগুলাে সেই প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃত ভাষাতেই তৈরি হয়েছিল।

এই তৈরির মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি অবশ্যই কাজ করেছে। শব্দগুলাে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে তৈরি। অঙ্কশাস্ত্রের হিসেবে দেখা যায় ০ থেকে ৯ পর্যন্ত যে সংখ্যা রয়েছে, এই দশটি হল মৌলিক সংখ্যা।

সংখ্যাবাচক হিসেবে বলবার সময় আমরা যে শব্দে এদের বলি, তারা হল, এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয় এবং শূন্য। এই মৌলিক দশটি সংখ্যা দিয়েই সব সংখ্যা তৈরি হয়েছে। ঠিক এরকমভাবেই দশটি মৌলিক সংখ্যাবাচক শব্দ দিয়েই তৈরি হয়েছে।

সমস্ত সংখ্যাবাচক শব্দ। যেহেতু এই মৌলিক সংখ্যাগুলাের নাম একটি শব্দে তৈরি, মূল থেকেই এভাবে পাওয়া গেছে, তাই এগুলােকে আমরা মৌলিক সংখ্যাবাচক শব্দ বলব।

বাংলা মৌলিক সংখ্যাবাচক শব্দগুলাে সংস্কৃত ভাষা থেকে এইভাবে এসেছে : এক > এক, দ্বৌ > দুই, ত্রি > তিন, চতুর, চত্বারি > চার, পঞ > পাঁচ, ষট > ছয়, সপ্ত > সাত, অষ্ট > আট, নব > নয়, দশ > দশ।

যৌগিক সংখ্যা শব্দ

অঙ্কশাস্ত্রে দেখা গেছে মৌলিক সংখ্যাগুলােকে শূন্যের সাহায্যে দশ দশ করে বাড়িয়ে একশাে পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এরপর দশের গুণিতকে ক্রমশই সংখ্যার বৃদ্ধি হয়ে, যথাক্রমে পাওয়া গেছে হাজার, লক্ষ, নিযুত, কোটি ইত্যাদি।

মৌলিক সংখ্যার নাম যােগ করে আমরাও তৈরি করেছি যৌগিক সংখ্যা শব্দ। যেমন: দুশের পরের সংখ্যাটিকে আমরা বলেছি একাদশ। এই একাদশবাচক শব্দটি তৈরি হয়েছে যৌগিক পদ্ধতিতে, এক + দশ’।

এরকমভাবে দ্বাদশকে পেয়েছি ‘দ্বি + দশ’ থেকে। এইভাবেই দশের গুণিতকে আমরা পাই, বিংশতি’ থেকে ‘বিশ ত্রিংশৎ থেকে ত্রিশ, চত্বারিংশৎ থেকে চল্লিশ, পঞ্চাশৎ থেকে পঞ্চাশ, ষষ্টিথেকে ষাট, সপ্ততি থেকে সত্তর, অশীতি থেকে আশি, নবতি থেকে নব্বই এবং শত থেকে শ’।

Read More:  পরীক্ষার পূর্ব রাত্রি রচনা লেখ

মূল সংস্কৃত সংখ্যা শব্দ উচ্চারণের দিক থেকে কীভাবে বর্তমান রূপ পেয়েছে, তার একটি তালিকা এখানে দেওয়া গেল। বলা বাহুল্য, এগুলাে সবই যৌগিক সংখ্যা শব্দ।

  • একাদশ > এগারাে
  • দ্বাদশ > বারাে,
  • ত্রয়ােদশ > তেরাে
  • চর্তুদশ > চৌদ্দ
  • পঞ্চদশ > পনেরাে
  • ষােড়শ > যােলাে
  • সপ্তদশ > সতেরাে
  • অষ্টাদশ > আঠারাে
  • ঊনবিংশতি > উনিশ
  • বিংশতি > বিশ, কুড়ি

সংখ্যাবাচক শব্দগুলাে কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার উদাহরণ কুড়ি পর্যন্ত দেখানাে হল। গণিত সংখ্যাবাচক একগুণ > এক গুণ, দ্বিগুণ > দুই গুণ, দুগুণ, দুনা, চতুর্থণ > চৌগুণা, পঙ্গুণ > পাঁচ গুণ।

পূৰ্ণবাচক শব্দ তৈরি

আগেই উল্লেখ করেছি, যে পদ বা শব্দের দ্বারা গণনাযােগ্য বস্তু বা বিষয়ের কেবল সংখ্যা নির্দেশিত না হয়ে, সংখ্যার নির্দিষ্ট ক্রমকে বােঝায়, সেই শব্দটিকেই আমরা পূরণবাচক বা ক্রমবাচক বা ক্রমাঙ্ক শব্দ বলি।

সংখ্যাবাচক শব্দ তৈরির বেলায় দেখা যায়, বাংলায় ওই শব্দ তৈরিতে নিজস্ব কোনাে পদ্ধতি তৈরি হয়নি। পূরণবাচক শব্দের বেলাতেও ঠিক একই কথা পুনরুক্ত করতে হয়।

এখানেও বাংলার নিজস্ব পদ্ধতির অভাব। আমরা মােটামুটিভাবে সংস্কৃত রীতিরই অনুসরণ করেছি। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে। যাইহােক, পূরণবাচক শব্দ তৈরিতে অনুসৃত পদ্ধতিগুলাে হল এইরকম:

এক, মৌলিক সংখ্যাগুলাের ক্ষেত্রে যা অনুসৃত হয়, পূরণবাচকের বেলাতেও ওই একই মৌলিকতা রক্ষিত। এক থেকে দশ পর্যন্ত ক্ৰম সংস্কৃত রীতিরই অনুসরণ।

যেমন: প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম এবং দশম। পরের যৌগিক সংখ্যাশব্দের পাশে ‘তমলিখে তৈরি করা হয় পূরণবাচক শব্দ।

যেমন: দ্বাদশতম, বিংশতিতম, ষট্‌বিংশতিতম, শততম ইত্যাদি। স্ত্রীলিঙ্গে এগুলাে অবশ্য তমা’ হয়ে যায়।

দুই, সাধারণ প্রয়ােগে এর কিছু কিছু ব্যতিক্রম হয়। তখন তম বা তমা থাকে না। যেমন: বিংশ শতাব্দী। তেরাে তারিখ। চোদ্দোশ সাল। দলের দ্বাদশ খেলােয়াড় ইত্যাদি।

তিন, পূরণবাচক শব্দ লিখবার সময় আমরা সমস্তটা বর্ণে না লিখে কখনাে কখনাে অঙ্কে লিখে তার গায়ে তম যােগ করি। যেমন:২৫তম, ৪৮তম, ১২৫তম, ১৫০তম ইত্যাদি।

Read More:  একটি নদীর আত্মকাহিনী রচনা লেখ (গঙ্গা নদী)

চার, আমরা কখনাে কখনাে ইংরেজি পদ্ধতিতে পূরণবাচক শব্দ লিখি। তবে এ শব্দটি লিখবার সময় সংখ্যা শব্দটি আগে বসাতে হয়, তার পরে বসে ইংরেজি নম্বর’ শব্দটি।

এইভাবে না বসালে ক্রম নির্দিষ্ট হয় না।  যেমন: বারাে নম্বর বেরি তিন নম্বর ছেলেটির দিকে নজর দিন। কারখানার এক নম্বর গেটে তােমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।

পাঁচ, মাসের তারিখের ক্রম বােঝাতে আমরা কিছু শব্দ হিন্দি থেকে নিয়েছি। যেমন: পয়লা আষাঢ়। দোসরা বৈশাখ। তেসরাজানুয়ারি। চৌঠা মে।

পাঁচ থেকে আঠারাে পর্যন্ত সংখ্যা পদে ই’প্রত্যয় জুড়ে এবং উনিশ থেকে বত্রিশ পর্যন্ত ‘এ’ প্রত্যয় যােগ করে তারিখের ক্রম নির্দেশ করা হয়। যেমন:পাঁচই বৈশাখ। সাতই জ্যৈষ্ঠ।

পাঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। ভাষা আন্দোলনের তারিখ একুশে ফেব্রুয়ারি।

ছয়, তেমনভাবে উল্লেখযােগ্য না হলেও, বাংলার নিজস্ব গুটিকয়েক পূরণবাচক শব্দ আছে। যেমন: মেজো, সেজো, নএবং দোজও তেজ। যেমন: মেজো ভাই মেধাবী।

সেজো মেয়েটি ভালাে গান গায়। বাবুদের নকর্তা খুব আমুদে। পারুলের বিয়ে হয়েছিল দোজ বরে। মণিকারও তেজ বরে বিবাহ।

সাত, বাংলা সংখ্যা শব্দের সঙ্গে র’অথবা এর’যােগ করে পূরণবাচক শব্দ তৈরি করার একটি পদ্ধতি আমাদের বাংলা ভাষায় চালু আছে।

যেমন: সাতের দশকের কবি। কুড়ির পাতায় একটি ছবি আছে।