রচনা লেখ : মানব জীবনে শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ

ভূমিকা

শিষ্টাচার ও সৌজন্যবােধ মানবজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। শিষ্টাচার ও সৌজন্যবােধ মানুষের মধ্যে এনে দেয় মনুষ্যত্বের উজ্জ্বল দীপ্তি। শিষ্টাচার মানুষকে ভদ্র, সুভদ্র ও শােভনসুন্দর করে গড়ে তােলে।

প্রাচীনকালে শিষ্টাচার

প্রাচীনকালে অধিকাংশ মানুষই ছিল শিষ্টাচারী। এই শিষ্টাচারের প্রথম শিক্ষা হত গুরুগৃহে। গুরু শিষ্যকে শিক্ষা দিতেন, ভদ্র-সভ্য-বিনীত আচরণ, গুরুজনদের শ্রদ্ধাজ্ঞান, সমবয়স্কদের সঙ্গে প্রীতিপূর্ণ আচরণ।

এখন গুরুগৃহের পরিবর্তে শিক্ষা দেওয়া হয় স্কুলকলেজে। কিন্তু সেখানে শিষ্টাচারের কোনাে শিক্ষাই দেওয়া হয় না।

আধুনিক সমাজ ও শিষ্টাচার

শিষ্টাচার ও সৌজন্যবােধের প্রথম পাঠ দেওয়া উচিত নিজের বাড়িতে। পিতা-মাতার প্রধান কর্তব্য হল ছেলেমেয়েকে শিষ্টাচার শেখানাে এই শিষ্টাচারই শিশুর মানসিক বিকাশে সাহায্য করে।

কিন্তু আধুনিক সমাজে সর্বত্র শিষ্টাচারের অভাব দেখা যায়।

শিষ্টাচারের পরিচয়

সমাজজীবনে এই শিষ্টাচারহীনতা ও অসৌজন্য বর্তমান শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত দেখা যায়নি। তখনও মানুষের মধ্যে বিনয় ও সৌজন্যবােধ ছিল। ছােটোরা বড়ােদের শ্রদ্ধা করত।

বাসে-ট্রামে-ট্রেনে বয়স্কদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ছােটোরা উঠে দাঁড়িয়ে তাদের বসতে দিত। অপরপক্ষে বয়স্করাও ছােটোদের সঙ্গে কথা বলার সময় স্নেহপূর্ণ বাক্যে কথা বলতেন। বাইরের ছেলেকেও তাঁরা ঘরের ছেলেই ভাবতেন।

বয়স্কদের আন্তরিকতা ছােটোদের মন স্পর্শ করত বলেই উভয়ের মধ্যে শিষ্টাচারের সুন্দর বিনিময় ঘটত।

সৌজন্য ও শিষ্টাচারের পরিবর্তন

পরিবর্তনশীল জগতে সব কিছুই পরিবর্তিত হচ্ছে পরিবর্তনশীল পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ফলে সৌজন্য, শিষ্টাচার, ভদ্রতা প্রভৃতি গুণাবলীরও রকমফের ঘটছে।

অতীতে এইসব মানবিক গুণাবলীগুলি প্রকাশের মাধ্যমে একজন লােক ভদ্র বলে পরিচিত হত।

অর্থাৎ অপরকে সম্মান দিয়ে নিজেকে সম্মানিত করবার মাধ্যমে যে আনন্দ, তা-ই সুজনের সৌজন্য নামে অভিহিত হত।

কিম্বা, একজন অতিথিকে রূঢ় আচরণে অসম্মানিত করে আনন্দ পাওয়ার মধ্যে শিষ্টাচারের কোন লক্ষণ আছে বলে অতীতে মনে করা হত না।

Read More:  একটি বেকার যুবকের আত্মকথা রচনা

ফোনে নিমন্ত্রণ করে শিষ্টাচার দেখানােও অতীতে অসম্ভব ছিল, অসম্ভব ছিল শুধু চা খাইয়ে অতিথি বিদায় করা।

কারণ, সে সময়ে সমাজে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা, পরিমিতিবােধ, ধর্মাধর্ম বােধ, কোnটা আচরণীয়, কোনta আচরণীয় নয়-এটা সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে বিচার্য হত।

পাশ্চাত্য দেশে শিষ্টাচার

প্রাচ্যের তুলনায় পাশ্চাত্য দেশগুলিতে শিষ্টাচার যথেষ্ট বেশি। ইউরােপের দেশগুলিতে মানুষ শিষ্টাচারে অনেক উন্নত।

নারীর প্রতি সম্মান, বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিপন্নের প্রতি সহায়তায় তারা অনেক উন্নত। কেউ কোনাে ঠিকানা জানতে চাইলে তারা আগ্রহ সহকারে সেই ঠিকানায় পৌঁছে দেয়।

সামাজ্য উপকারের বিনিময়ে তারা ধন্যবাদ দেয়, কিংবা উপকারের বিনিময়ে প্রত্যুপকার করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

ছাত্রজীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব

ছাত্র-ছাত্রীরা যেহেতু শিক্ষিত এবং শিক্ষার মধ্যে তাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে ও তারা যেহেতু যুবক-যুবতী তাই তাদের কাছে মনুষ্যত্ববৃত্তির স্বরূপ বেশি মাত্রায় থাকবে, এটা সকলেই কামনা করে।

দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের মুখ আয়নায় ফেললে দেখে নিতে পারি, কিন্তু অন্তরকে দেখবার উপায় হল সৌজন্য, শিষ্টাচার-যার দ্বারা একজন মানুষের অন্তরস্থিত সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

ছাত্রজীবনে সুকুমার প্রবৃত্তিগুলির যে বৃহৎ সম্ভাবনা থাকে তা সৌজন্য ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে।

তৃতীয়ত, একজন ছাত্র-ছাত্রী সৎভাবে কাজ করে তাদের সৌজন্য ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে পরমের আশীর্বাদ পেতে পারে।

চতুর্থত, সৌজন্য ও শিষ্টাচার মানুষকে আন্তরিক ও সরল স্বভাবের করে তােলে। তাই একজন ছাত্র-ছাত্রী সরল ও স্বতস্ফূর্ত এবং আন্তরিক হয়ে উঠতে হলে চাই সৌজন্য ও শিষ্টাচার।

পঞ্চমত, মেকলে মনে করতেন, আমাদের মানুষের জীবনে বিভিন্ন কাজে বদান্যতার প্রকাশ আমাদের ভদ্র করে তােলে। একজন মানুষ নিজে যেভাবে মানুষের ভালােবাসা পেতে চায়, সেভাবে অপরকে ভালােবাসাই হল শিষ্টাচার।

এই শিষ্টাচার মানুষের মধ্যে আনে নিরপেক্ষতাবােধ ও স্বার্থত্যাগের মন্ত্র।

ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিষ্টাচার ও ভদ্রতা জাগ্রত হলে স্বার্থত্যাগকে মূল মই হিসেবে মনে করে তারা সমাজে একজন হয়ে উঠতে পারে।

Read More:  একটি বন্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

শিষ্টাচারহীনতার সামাজিক প্রভাব

শিষ্টাচারের অভাবে আমাদের জাতীয় জীবন বিপর্যস্ত। শিষ্টাচারের অভাবে আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের মহিমা পরিস্ফুট হয় না। আমরা অকারণে মানুষের অসুবিধা ঘটাই, সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করি।

শিষ্টাচারের অভাবে জীবন নীতিহীন ও আদর্শহীন। শিষ্টাচারের শিক্ষা মানুষকে মানবধর্মে উজ্জ্বল করে তােলে। আমরা কিন্তু সেই শিক্ষা পাচ্ছি না। ফলে আমাদের দেশের মানুষ অনেক বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে।

প্রতিবন্ধকতা দূর করার উপায়

ছাত্র-ছাত্রীদের প্রয়ােজন তাদের মধ্যে ঔদ্ধত্য ও অহমিকাকে বিসর্জন দেওয়া। কারণ তা শিষ্টাচার-এর পরিবর্তে ভ্ৰষ্টাচারকে প্রকাশ করে। তাছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের সহনশীল মনােবৃত্তি থাকা দরকার।

সহনশীল না হলে সৌজন্য ও শিষ্টাচার আসে না, অপরকে সম্মান দেবার প্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রমবিমুখতা ও আলস্য অসৌজন্য ও ভ্রষ্টাচারের আতুড় ঘর।

সত্যের পথিকরূপে, অন্তরের স্বরূপকে প্রকাশ করে, সরলতা ও ভদ্রতার সঙ্গে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের সুজন ও সদাচারী হয়ে ওঠা সমাজের পক্ষে একান্ত প্রয়ােজন।

উপসংহার

শিষ্টাচার মনুষ্যত্বের উদবােধক। শিষ্টাচার সম্পর্কে আমাদের সকলের আজ গভীরভাবে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। মানুষ আজ আদর্শচ্যুত হয়ে উদভ্রান্ত ও উন্মত্ত।

আমাদের আজ নীতিশিক্ষার মাধ্যমে শিষ্টাচার ও সৌজন্যবােধ শিক্ষারও প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। শিষ্টাচারই পারবে আমাদের ঐতিহ্যসচেতন করতে ও সনাতন মূল্যবােধ ফিরিয়ে আনতে।

শিষ্টাচারের মধ্য দিয়েই আমাদের আবার নবজাগরণ ঘটবে।

শিষ্টাচারের জন্য একদা ভারতের যে গৌরব ছিল, আবার তা ফিরিয়ে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, অশিষ্ট আচরণের মধ্যে দিয়ে মানুষ আপন পরিচয়ে হীন হয়ে যায়।

বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে মানুষ শিষ্টাচারে অনেক অগ্রণী। তাই তারা মনুষ্যত্বেও উজ্জ্বল।

তাই দেশকে উন্নত করতে হলে সর্বাগ্রে শিষ্টাচার ও সৌজন্যের শিক্ষা নিতে হবে।