রচনা লেখ : পিতা মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

সূচনা

দেবদেবীর কথা আমরা শাস্ত্রে পড়েছি অথবা গুরুজনদের নিকট হতে জেনেছি। কিন্তু তাদের আমরা চোখে দেখিনি, তাদের কাল্পনিক মূর্তি গড়িয়া আমরা তাদের পূজা করি।

তবে এই কথা আমরা সকলেই জানি যে তাদের পূজা করতে হয়, শ্রদ্ধা করতে হয়, কখনােও তাদের অসম্মান করতে নেই।

কিন্তু এই ধূলায় পৃথিবীতে যে অন্ততঃ দুজন সাক্ষাৎ দেবদেবী আমাদের মধ্যে সর্বদাই আছেন- যারা সব সময় আমাদের মঙ্গল চিন্তায় আকুল, তারা আমাদের অতি নিকটে থাকে বলেই বােধ হয়।

তাদের আমরা কাল্পনিক দেবদেবীর মত শ্রদ্ধা ভক্তি করি না। তারা আমাদের পিতামাতা।

মাতা দশমাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেও নিজের দেহ থেকে রক্ত দিয়ে আমাদের শিশুদেহ গড়ে তােলেন- আমাদের জন্য মৃত্যু সমান যন্ত্রনাকেও হাসিমুখে সহ্য করেন।

আর পিতা তাঁহার সুখ স্বাচ্ছন বিসর্জন দিয়ে কেবল পুত্রকন্যার কল্যাণের জন্যই সমস্ত জীবন চিন্তায় অতিবাহিত করেন। এনারা যদি দেবদেবী না হন, তাহলে স্বর্গেই হোক আর মর্তেই হউক দেবদেবী আর কে আছেন?

বাবা মায়ের স্নেহ

জন্মগ্রহণ করার পর অসহায় শিশুকে বুকে তুলে নেন মাতা। যতদিন না শিশুসন্তান বড় হয় ততদিনই তিনি তাদের মলমূত্রাদি পরিষ্কার করেন, অসুস্থ সন্তানদের সেবা করেন।

তাদের সেবায় মাতা রাতের পর রাত সন্তানের মাথার কাছে বসে কাটিয়ে দেন। তার জন্য কোনো বিরক্তি নেই, ক্রোধও নাই- আছে অসীম স্নেহ সুধা। সংসারে কুপুত্রের অভাব নেই, কিন্তু কুমাতা কখনােও দেখা যায় না।

সন্তান বড় হলেই পিতার দায়িত্ব। কি করে  সন্তান জীবনে বড় হবে, কি করিয়া সে দশজনের একজন হবে, কি করে নিজের পায়ের উপর নিজেই দাড়াতে পারবে তারই জন্য পিতা সর্বদা সচেষ্ট থাকেন।

সমস্ত জীবনের সম্বল তিনি সন্তানদের  জন্যই ব্যয় করেন, নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তাও করেন না।

Read More:  প্রথাগত শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা রচনা

পিতা কখনও আশা করেন না যে পুত্র বড় হইয়া তাঁহাকে লালন পালন করবে- তাকে পালন করা পুত্রের কর্তব্য; তার কর্তব্য তাহাকে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া।

যারা আমাদের জন্য এত করেন, যারা আমাদের জন্য নিজের জীবনের দিকেও লক্ষ্য রাখেন না তাদের প্রতি কর্তব্য অবশ্যই আমাদের আছে এবং সে কর্তব্য আমাদের পালন করতেই হবে।

সন্তানের কর্তব্য

পিতামাতার আদেশ অমান্য না করা, তাদের শ্রদ্ধা করা, পুত্র কন্যার প্রাথমিক কর্তব্য। বাল্যে, কিশােরে এবং যৌবনে পিতামাতার উপদেশ পালন করাই আমাদের উচিত।

আমাদের এমন কোন কাজ করা উচিত নয় যাতে তাঁহারা ব্যথা বা অশান্তি অনুভব করেন। মাতাপিতা বৃদ্ধ হলে স্বভাবতঃই অসহায় হয়ে পড়েন ; পুত্র কন্যাদের অবলম্বন করেই তারা বেঁচে থাকেন।

এই বয়সে যাতে তারা কোন প্রকারে আমাদের নিকট হইতে ব্যথা না পান সেইদিকে লক্ষ্য রাখা আমাদের একান্ত কর্তব্য। কারণ যাদের জন্য তারা নিজেদের জীবনের দিকে তাকাবার অবসর পর্যন্ত পান নাই, তাহাদের নিকট হতে অক্ষম বৃদ্ধ আঘাত পাওয়া তাদের কাছে খুবই কষ্টদায়ক।

পিতামাতার আদেশ অমান্য না করা, তাহাদের শ্রদ্ধা করা, পুত্র কন্যার প্রাথমিক কর্তব্য। বাল্যে, কৈশােরে এবং যৌবনে পিতামাতার উপদেশ পালন করাই আমাদের উচিত।

অক্ষম বৃদ্ধ পিতামাতার সেবা শুশ্রষা করা প্রত্যেক সুসন্তানেরই কর্তব্য। জগতে অন্য ঋণ তবু শােধ করা যায় কিন্তু পিতামাতার ঋণ শােধ করা যায় না।

কারণ তাদের ত্যাগকে সামান্য অর্থ দিয়ে ক্রয় করা অসম্ভব। মাতাপিতার সকল স্বপ্ন সন্তানকে ঘিরে-সেই স্বপ্ন, যাতে আমরা আমাদের জীবনে সফল করতে পারি-সেই দিকে  আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। এই জগতে পিতা আমাদের কাছে স্বর্গতুল্য, মাতা স্বর্গ অপেক্ষাও গরীয়সী।

মহাপুরুষদের নিদর্শন

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষদের জীবনের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ্য করব যে তারা প্রত্যেকেই সমস্ত জীবন ধরে মাতা পিতার সেবা করছেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মাতৃভক্তির কথাটা অনেকটা প্রবাদ বাক্যের মত।

Read More:  বিশেষণের তর ও তম বলতে কি বুঝ

মাতার ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি যে শুধুমাত্র বহুমূল্যের চাকরী ত্যাগ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নিজের জীবন বিপন্ন করে তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ দামােদর নদেও ঝাপ দিয়াছিলেন।

স্যার আশুতােষ তাে মায়ের আদেশ লঙ্ঘন করতে হবে বলে বিলাত যেতে পারেন নাই।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মাতৃভক্তির কথা সর্বজন বিদিত। জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম জীবনে নাবিক হতে চেয়েছিলেন।

মায়ের আশীর্বাদ ভিক্ষা করায় মাতা অপূর্ণ নয়নে পুত্রকে আশীর্বাদ করেন। মাতার মনােভাব বুঝতে পেরে জর্জ আর সমুদ্রযাত্রা করতে চাইলেন না। মা তার পুত্রকে আশীর্বাদ করলেন, “জর্জ, যে সন্তান মাতাপিতার মনে কষ্ট দেয় না, ঈশ্বর তাকে আশীর্বাদ করেন”।

পুত্রের জীবনে মাতার এই আশীর্বাদ ফলেছিল। তিনি ভবিষ্যৎ জীবনে আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্র প্রধান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

রামায়ণের নায়ক রামচন্দ্র পিতৃ আদেশ পালনের জন্য রাজার দুলাল হয়েও চোদ্দ বৎসর বনবাসী হয়েছিলেন- ইহার জন্য পিতার বিরুদ্ধে তাঁহার কোন অভিযােগ তাে ছিলই না বরং মৃত পিতার আদেশ যাতে যথাযােগ্যভাবে পালন হয়, তার জন্য তার চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না।

উপসংহার

জীবনের প্রভাতকাল হতে সন্ধ্যাকাল পর্যন্ত মাতাপিতার স্নেহ দৃষ্টি সন্তানকে ঘিরে থাকে। জীবনের প্রতিটি সংকটেই সন্তান মাতাপিতার আশীর্বাদ হতে বঞ্চিত হয় না। মাতাপিতার নিকট সন্তান কখনােই বৃদ্ধ হয় না।

সেই পরমারাধ্য দেবদেবীর প্রতি আমাদের অবিচল শ্রদ্ধা ও ভক্তি দান করতে হবে। যে সন্তান মাতাপিতাকে অশ্রদ্ধা করে, তাদের অন্তরে ব্যথা দেয়, বৃদ্ধ বয়সে তাদের অবহেলা করে, তাহারা পশুর সমান।

মাতা-পিতাকে দুঃখ দেওয়ার মত এত বড় পাপ বােধ হয় আর পৃথিবীতে নাই। তাই প্রতিটি সন্তানেরই কর্তব্য হওয়া উচিত যথাসাধ্য তাহাদের আদেশ উপদেশ পালন করে চলা। তবেই আমরা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারব।