মনিষীদের জীবনীপাঠের উপযোগিতা প্রবন্ধ-রচনা

ভূমিকা

যে কোনাে মানুষকে উন্নত হতে হলে তার  কাছে থাকা উচিত আদর্শ ও প্রেরণা। এই আদর্শ ও প্রেরণা যদি মনীষীদের ভূমিকা জীবনী ও কর্ম হয় তাহলে মানুষের জীবনে হারাবার কিছু থাকে না।

সেজন্য জীবনচর্যার ক্ষেত্রে ‘মহাজনাে যেন গতঃ স পন্থা’-এই নীতি সর্বাংশে সত্য।

একথা ঠিকই, আমরা আধুনিক মানুষ জীবনে সুখ ও শান্তি পেতে চাই, কিন্তু কীভাবে তা পেতে পারি সেই পথনির্দেশের অভাবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সুখ ও শান্তি তাই অধরা থেকে যায়। সেদিক থেকে মনীষীদের জীবনীপাঠ আমাদের জীবনকে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে তুলতে পারে।

সঙ্গ ও শিক্ষা

কথায় আছে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।

সেই সঙ্গ যদি হয় বই এবং বইটি যদি কোনাে আদর্শ জীবনী গ্রন্থ হয় তাহলে সেই জীবনীপাঠের শিক্ষা মানুষকে তার বাঞ্ছিত লক্ষ্যে পৌছে দিতে সাহায্য করে।

একবার শ্রীরামকৃষ্ণ  সঙ্গ ও শিক্ষা সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুই বাকা কেন রে? উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, সাধে কি বাকা হয়েছি, সাহেবের চটির গুতােয় বাকা হয়েছি।

অর্থাৎ ইংরেজ শাসকের অধীনে কাজ করতে গিয়ে যে আত্মসম্মানটাও নষ্ট হয়ে গেছে-সেটিই ইঙ্গিত করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। অর্থাৎ সঙ্গ যে মানুষকে অবনত উন্নত করতে পারে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।

উপযোগিতা

বর্তমান সময় প্রগতির যুগ হলেও এই প্রগতি অনেকটাই পরানুকরণ সর্বস্ব। আমরা পরানুকরণ করি সাধারণত মন্দ দিকটা, ভাল দিক অনুকরণ কমই করি।

তাই অনুকরণ করছি যে বিষয় তা আমাদের ভবিষ্যতে কতটা দরকার তা না ভেবে অপরে যেহেতু করছে, সেটিকেই গ্রহণ করছি-অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে। তাই তাতে থেকে যাচ্ছে ঝুঁকি।

অথচ মনীষীদের জীবনীপাঠ করে তাদের আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা, ঐতিহ্য প্রীতি, স্বদেশপ্রেম, সহযােগিতা, আত্মত্যাগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, শৃঙ্খলা-নিয়মানুবর্তিতা, তেজস্বিতা-বীরত্ব প্রভৃতি আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং সেই অনুপ্রেরণা সঞ্জরিত হলে আমাদের জীবনও আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে।

Read More:  তুমি সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী যে ট্রেনে আরোহন করিয়াছ

কেননা আমরা ঘরের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুরকে ভজনা করছি।

একেই প্রগতির লক্ষণ হিসেবে হাজির করছি, যার ফলে সমাজ ও সংস্কৃতি যখন মূল্যবােধহীনতা ও অপসংস্কৃতির দীনতায় দিশেহারা তখন মনীষীদের জীবনীপাঠ সেই অবনমন থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।

মনীষীর জীবনী পাঠ

এই দেশের মাটি যে কত মনীষীদের পাদস্পর্শে পবিত্র হয়ে রয়েছে সেই দিকটি সংশ্লিষ্ট সকলকে নতুন প্রজন্মের কাছে মেলে ধরতে হবে।

কেননা তাদের কর্ম, কীর্তি, ত্যাগ ও বৈরাগ্যের যে মহিমা ভারতের মহান আদর্শকে গড়ে তুলেছে, আজ সেইসব মনীষীদের মহাজীবনের কাহিনি বিস্মৃত হয়ে থাকলে  আমাদের দুর্গতি বাড়বে বই কমবে না।

বুদ্ধ, চৈতন্য, মহাবীর, নানক, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গান্ধীজি, নেতাজি, ক্ষুদিরাম, মাতঙ্গিনী, রামমােহন, বিদ্যাসাগর, জগদীশচন্দ্র প্রভৃতি মনীষীদের জীবনসাধনায় এই দেশের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।

এঁদের জীবনী পাঠ করলে আমরা আমাদের অন্তরের অন্ধকার সরিয়ে আলাের দিশা পেতে পারব, পেতে পারব।

সমস্যাদীর্ণ এই জীবন থেকে উদ্ধারের প্রকৃত পথের সন্ধান। শুধু এদেশের নয়, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবনকথা (যীশু, হজরত মহম্মদ, নেপােলিয়ান, আব্রাহাম লিঙ্কন, নিউটন, আইনস্টাইন, সেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রােমা রােলাঁ, টলস্টয়, মাইকেল এঞ্জেলাে প্রভৃতি)।

তাদের ত্যাগ ও আদর্শের দৃষ্টান্ত আমাদের জীবনে কর্মোদ্যম ও সুস্থ চিন্তাকে জাগ্রত করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

ছাত্রজীবন ও জীবনী পাঠ

ছাত্রজীবন চরিত্রগঠন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশ তথা সার্বিক বিকাশের উপযুক্ত ক্ষেত্র। তাই ছাত্রছাত্রীদের সামনে মনীষীদের জীবনীকে উপস্থিত করতে পারলে, তাদের চারিত্রিক গুণাবলীকে যথাযথভাবে অনুধ্যান করলে যে কোনাে ছাত্রছাত্রীর সার্বিক বিকাশ যে সুষ্ঠ ও সুন্দর হবে সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ
থাকে না।

বর্তমান ছাত্রসমাজের কিছু অংশ অনেকটা বিপথগামী তার অন্যতম কারণ যথার্থ আদর্শ ও প্রেরণার অভাব।

সেক্ষেত্রে সেই আদর্শ ও প্রেরণা যদি মনীষীদের জীবনী হয় এবং সেই জীবনী পাঠের ক্ষেত্র যদি প্রসারিত করা যায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, তাহলে সুফল আসতেই পারে।

Read More:  অরণ্য ও অরণ্য প্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রচনা

এজন্য প্রয়ােজন উপযুক্ত পরিকাঠামাে, সদিচ্ছা এবং সার্বিক সচেতনতা। সেজন্য জাতীয় জীবনে প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন তথা সুস্থ সংস্কৃতি চেতনার জাগরণ-যা মনীষীদের জীবনীপাঠে সম্ভবপর।

উপসংহার

মনীষীদের জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে আমাদের জীবনে শিক্ষণীয় উপাদানগুলিকে গ্রহণ করতে হবে বর্তমান সময়ের উপযােগী করে।

শুধু জীবনী পাঠ করলে হবে না, জীবনের সার অংশগুলিকে অন্তরে লালন ও পালন করে বাস্তব জীবনে তা প্রয়ােগ করতে হবে যথাযথ ভাবে, তাহলে মগবাদের কর্ম, চিন্তা, সাফল্য, ব্যর্থতা আমাদের জীবনকে বাতি লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এই বস্তুবাদী, স্বার্থপর, পলায়নপর মনােভঙ্গির মানুষদের কাছে বিকল্পই বা আর কোথায়?