বাক্যের সাধারণ গঠন: উদ্দেশ্য ও বিধেয়

বাক্যের গঠন বিষয়ে আলােচনা করার আগে, বাক্য বলতে আমরা কী বুঝি সে বিষয়ে একটু জেনে নেওয়া দরকার। বাক্য হল, কয়েকটি পদের সমষ্টি। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়।

যে পদ বা পদসমষ্টির মাধ্যমে কোনাে বিষয়ে বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়, সেই পদ বা পদসমষ্টিকে আমরা বাক্য বলি। এই হল বাক্যের সংজ্ঞা। মােটকথা হল, মনের ভাবপ্রকাশক যথাযথ সংখিত পদসমষ্টিকে বলে বাক্য।

বাক্য কীভাবে গড়ে ওঠে এবং ওই বাক্য কীভাবে সম্প্রসারিত হয়, তা এইভাবে পরীক্ষা করে দেখা যায়।

  • সূর্য ওঠে।
  • পুব আকাশে সূর্য ওঠে। সকাল বেলায়
  • পুব দিকের আকাশে রক্তবর্ণ সূর্য ওঠে।

উপরে লেখা তিনটি পদ বা শব্দসমষ্টিই অর্থে ও গঠনে এক একটি পরিপূর্ণ বাক্য। এটাই হল বাক্যের সাধারণ গঠন এখান থেকে বােঝা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ অর্থবহ হতে হলে বাক্যে কমপক্ষে দুটি পদ বা শব্দ থাকা চাই। এরা হল, কর্তা ও ক্রিয়া। স্পষ্টভাবে হােক বা উহ্যভাবে হােক, এদের হাজির থাকতেই হবে।

এরা যেখানে স্পষ্টভাবে থাকে, তার উদাহরণ হল : রাম খায়। জল পড়ে। পাতা নড়ে। পাগলে বলে। ছাগলে খায়। উহ্যভাবে এরা থাকলে, সে বাক্য কেমন হয়, তার উদাহরণ :

(ক) কর্তা উহ্য: নেবে? -নেব। অর্থাৎ, তুমি নেবে? -আমি নেব। এখানে তুমি’ ও ‘আমি’ দুই কর্তাই উহ্য।

(খ) ক্রিয়া উহ্য : কে ওখানে? -আমি। অর্থাৎ, কে রয়েছে ওখানে? -আমি রয়েছি। এখানে রয়েছে এবং রয়েছি এই দুটি ক্রিয়াই উহ্য।

(গ) কর্তা ও ক্রিয়া উভয়েই উহ্য : যাবে? না। অর্থাৎ, সে কি যাবে? না, যাবে না। এখানে ‘সে’ কর্তা এবং যাবে’ ক্রিয়া উভয়েই উহ্য।

বর্তমান আলােচনা থেকে এটি খুবই স্পষ্ট যে সম্পূর্ণ অর্থবহ বাক্য পেতে হলে, বাক্যে কমপক্ষে দুটি পদ বা শব্দ থাকা চাই। সে দুটি হল কর্তা এবং ক্রিয়া।

 

 উদ্দেশ্য ও বিধেয়

প্রতিটি বাক্যের ভিতর দুটি করে অংশ থাকা আবশ্যিক। ঘুরিয়ে বলা যায়, প্রত্যেক বাক্যে দুটি করে অংশ বা অঙ্গ থাকলে, তবেই তা বাক্যের চেহারা পায়। এই অংশ বা অঙ্গ হল দুটি উদ্দেশ্য এবং বিধেয়।

এখানে আমাদের জিজ্ঞাসা, উদ্দেশ্য কাকে বলে? এবং বিধেয়ই বা কী? বৈয়াকরণরা এ-বিষয়ে বলেছেন, যার উদ্দেশ্যে বা সম্বন্ধে কিছু বলা হয়, তাকে বলে উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বিধান করা হয়, অর্থাৎ যা বলা হয়, তাকে বলা হয়, বিধেয়।

উদাহরণ হিসেবে একটি বাক্য নেওয়া গেল। বাক্যটি হল, রামবাবু মাছ ধরছেন। এই বাক্যে রামবাবু হল উদ্দেশ্য, আর মাছ ধরছেন অংশটি হল বিধেয়।

বৈয়াকরণরা দেখেছেন, বাক্যে ন্যূনতম একটি কর্তৃপদ যা উদ্দেশ্য এবং ন্যূনতম একটি সমাপিকা ক্রিয়াপদ, যা বিধেয়, তা থাকা চাই। অর্থাৎ এটি সব বাক্যে থাকে। একান্ত আবশ্যিক। নতুবা বাক্যই হয় না।

বাংলা ভাষার বাক্যরীতিতে সাধারণত উদ্দেশ্য প্রথমে থাকে, পরে বা পিছনে যা থাকে, তা হল বিধেয়। এই উদ্দেশ্য এবং বিধেয়র সঙ্গে আরও নানা শব্দ বা পদ যুক্ত হয়ে বাক্যের উভয় অংশকেই প্রসারিত করতে পারে।

সম্বন্ধ পদ, বিশেষণ, কৃদন্ত ইত্যাদির যােগে উদ্দেশ্যকে এবং কর্মসম্পাদন বা অন্য কারণে প্রযুক্ত বিশেষ্য, বিশেষণ অথবা অব্যয়যােগে বিধেয়কে প্রসারিত করা যেতে পারে। এই প্রসারণ কীভাবে হতে পারে, তা দেখার জন্য একটি বাক্য উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক।

বাক্য: ছেলেটি পড়ছে। এখানে ছেলেটি হল উদ্দেশ্য এবং পড়ছে হল বিধেয়। উদ্দেশ্য এবং বিধেয় অংশ কীভাবে পদযুক্ত হয়, তা বাক্যটি সম্প্রসারিত করলেই চোখে পড়বে।

সম্প্রসারিত বাক্য: বিদ্যালয়ের সেরা ও মেধাবী ছেলেটি পরীক্ষার আগে ঘরে বসে মন দিয়ে পড়ছে। এখানে এই বাক্যটিকে উদ্দেশ্য ও বিধেয় অংশ ভাগ করে দেখালে, বাক্যের যে । চেহারাটি ধরা পড়ে, তা এই রকম :

  • উদ্দেশ্য: বিদ্যালয়ের সেরা ও মেধাবী ছেলেটি।
  • বিধেয়: পরীক্ষার আগে ঘরে বসে মন দিয়ে পড়ছে।

এই বাক্যটিতে মূল উদ্দেশ্য পদ হল, ছেলেটি এবং মূল বিধেয় হল পড়ছে। সম্বন্ধ পদ ‘বিদ্যালয়ের’, বিশেষণ পদ ‘সেরা’ ও ‘মেধাবী’ উদ্দেশ্য ছেলেটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে উদ্দেশ্যের অঙ্গীভূত বা অংশীভূত হয়ে গেছে।

ওদিকে পড়ছে বিধেয় পদের সঙ্গে কারকে প্রযুক্ত বিশেষ্য-বিশেষণ ইত্যাকার যুক্ত হয়ে বিধেয়র অঙ্গীভূত হয়েছে। মােটকথা, ওই উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে এরা সম্প্রসারিত করেছে। তাই ওই প্রসারক শব্দগুলােকে উদ্দেশ্য প্রসারক ও বিধেয় প্রসারক বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলা যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় একই বাক্যে একের বেশি উদ্দেশ্য পদ রয়েছে বলে ভ্রম হয়। যেমন: আমি মধু আর তুমি আজ খেলতে যাব না।

এখানে আমি, মধু, তুমি তিনটিকে উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যাক। এখানে আমি, মধু ও তুমি র মাধ্যমে তিনটি পক্ষ-আমি, তুমি ও সে পক্ষ ব্যবহৃত হলেও, বিধেয় ক্রিয়া কাকে অনুসরণ করছে? বিধেয় ক্রিয়া হল, যাব। ক্রিয়ার এই রূপটি সে পক্ষ বা তুমি পক্ষের ভবিষ্যৎ রূপ নয়।

ক্রিয়াটি আমি পক্ষের অনুগামী ভবিষ্যৎ রূপ এবং ক্রিয়ার সংখ্যা একটি। সুতরাং উদ্দেশ্য হল আমি এবং যাব হল বিধেয় ক্রিয়া পদ। ঠিক এইভাবেই একাধিক ক্রিয়া পদ বাক্যে এসে বিধেয় ক্রিয়ার সঙ্গে গােল বাধাতে পারে। এই ধরনের একটি উদাহরণ হল, মাস্টারমশাই যা বলেন, আমি তা লিখি।

এখানে বলেন এবং লিখিক্রিয়া পদে গােল বাধতে পারে। মনে হতে পারে, দুটিই বুঝি বিধেয় ক্রিয়া পদ। এ ব্যাপারে খুঁজে দেখা দরকার সমাপিকা ক্রিয়া পদ কোনটি এবং সেটি উদ্দেশ্য অংশের আমি-কে অনুসরণ করছে কি না! বলা বাহুল্য, এখানে উদ্দেশ্য হল, আমি এবং বিধেয় ক্রিয়া পদ হল লিখি।

বাক্যের প্রথম অংশের আলােচনায় দেখানাে হয়েছে, একটি বাক্য তৈরি হতে গেলে কমপক্ষে একটি কর্তা এবং কমপক্ষে একটি ক্রিয়া থাকা দরকার। তবে বাক্যের প্রয়ােগরীতিতে কখনাে কখনাে কর্তা উহ্য থাকে, কখনাে বা ক্রিয়া। কর্তা ও ক্রিয়া দু’জনেই কখনাে কখনাে উহ্য থাকতে পারে।

এরকম দৃষ্টান্ত আমরা উদ্দেশ্য ও বিধেয়র বেলাতেও দেখতে পাই। কর্তা ও ক্রিয়ার পরিবর্তে উদ্দেশ্য ও বিধেয় শব্দ দুটি এ ব্যাপারে প্রয়ােগ করলেই চলবে। যেমন :

১। উদ্দেশ্য উহ্য: নেবে? -নেব। এখানে উহ্য উদ্দেশ্য বসালে বাক্যটি হবে: তুমি নেবে? -আমি নেব। অর্থাৎ, এই বাক্যে তুমি ও আমি উদ্দেশ্য।

২। বিধেয় উহ্য: কে ওখানে? আমি। এখানে উহ্য বিধেয় ক্রিয়া বসলে বাক্যটি হয়-কে ওখানে হও? আমি হই। এখানে হও এবং হই হল বিধেয় ক্রিয়া।

৩। উদ্দেশ্য ও বিধেয় উভয়ই উহ্য: যাবে? না। এখানে উহ্য উদ্দেশ্য ও বিধেয় বসালে বাক্যটি হয়। সে যাবে? -সে যাবে না। এখানে সে হল উদ্দেশ্য এবং যাবে হল বিধেয় ক্রিয়া।