বাংলার লোকসংস্কৃতি ও তার বৈচিত্র রচনা

ভূমিকা

‘লােকসংস্কৃতি’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দুটি শব্দ পাওয়া যায়।

এই দুয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে লােকসংস্কৃতি এবং এই ধারা প্রবহমান।‘লােক’ বলতে বােঝায় সাধারণ লৌকিক মানুষ।

এই ‘লােক’ আসলে যৌথ জীবনভাবনা থেকে উখিত এবং যৌথ জীবনভাবনাকেই এই লােকজীবন প্রসারিত করে।

অন্যদিকে সংস্কৃতি হল জীবনচর্যার উৎকর্ষ। সুতরাং লৌকিক জীবনের যে জীবনচর্যার উৎকর্ষ আমরা বিভিন্ন পরম্পরায় প্রবাহিত হতে দেখছি, তাকেই লােকসংস্কৃতি বলতে পারি।

স্বরূপ ও বৈচিত্র্য

বাংলার লােকসংস্কৃতির কাঠামােটি তিনটি ধারায় বিকশিত হয়েছে-আদিম সংস্কৃতি, লােকসংস্কৃতি এবং উচ্চ বা দরবারী সংস্কৃতি।

আজও পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতাল, মুণ্ডা, লােধা, খেরিয়া, ওঁরাও, গােখা প্রভৃতিদের মধ্যে আদিবাসী সংস্কৃতির একটি ভিন্ন ধারা বজায় রয়েছে।

সেই লােকসংস্কৃতির ধারার পরিবর্তন বেশ মন্থর। কারণ তা গােষ্ঠী জীবনভিত্তিক। অন্যদিকে অভিজাত সংস্কৃতি যেহেতু ব্যক্তিকেন্দ্রিক তাই তার দ্রুত বদলও অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

শিক্ষার প্রসার ও যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি এই সংস্কৃতিকে পরিবর্তিত করে।

লােকসংস্কৃতিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়: বস্তুকেন্দ্রিক, বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক, খেলাধুলাকেন্দ্রিক, বাককেন্দ্রিক, অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক, লিখন বা অঙ্কনকেন্দ্রিক।

বস্তুকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

লােক সমাজে ব্যবহৃত বস্তুগুলি এই শ্রেণির লােকসংস্কৃতির উদাহরণ। যেমন

(১) কৃষিকেন্দ্রিক জীবনচর্যার বস্তুকেন্দ্রিক উপাদান হল: ঢেঁকি, কুলাে,ধামা, ঝুড়ি, কুঁচো, কোদাল, নিড়ানি, লাঙল, মই, মরাই, কাস্তে, কাটারি, বঁটা ইত্যাদি।

(২) আবার জেলে বা মালােদের বস্তুকেন্দ্রিক উপাদান হল: নৌকো, হাল, দাঁড়, লগি, জাল, খালুই, জাল বােনার সরঞ্জাম প্রভৃতি।

বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

উৎসব, অনুষ্ঠান, প্রথা, সংস্কার, বিশ্বাস এই লােকসংস্কৃতির পর্যায়ে পড়ে। অনুষ্ঠানের মধ্যে তিনটি প্রধান-অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। এই তিনটি অনুষ্ঠানই লােকসমাজে বিশেষ প্রচলিত।

Read More:  শারীরিক ব্যায়াম নিয়ে প্রবন্ধ রচনা লেখ

খেলাধুলাকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

লােকজীবনে খেলাধুলা ছিল অবসর বিনােদনের একটি বিশেষ মাধ্যম। বিশেষ করে শিশু ও কিশােরদের মধ্যে খেলাধুলা বিশেষ প্রচলিত ছিল।

বাংলার লােকসমাজে হা-ডু-ডু, বৌ বসন্ত, লুডাে, ডাংগুলি, পাশা, লুকোচুরি, কানামাছি, এক্কাদোক্কা, বুড়ােবুড়ি, আগডুম বাগডুম প্রভৃতির প্রচলন ছিল।

বাককেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

লােকসংস্কৃতির এই শাখাটি সর্ববৃহৎ। লােকমুখে প্রচারিত স্মৃতিবাহিত ও শ্রুতিনির্ভর এই ধারাকে বাককেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি বলা হয়।

ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, লােকসঙ্গীত, লােককথা, গীতিকা প্রভৃতিতে লােকসংস্কৃতির নানা উপাদান ছড়িয়ে আছে। লােককথাতে লােকজীবনের নানা বিশ্বাস ও সংস্কার উদঘাটিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রতকথাগুলিতে লৌকিক জীবনের সংস্কার যেমন, পুত্রকামনায় নানান অনুষ্ঠান করার পরিচয় পাই।

ব্রতকথায় দেখা যায় নানান সংস্কার। যেমন, দেবতার পায়ে মাথা খােটা, তেত্রিশ কোটি দেবতার দুয়ারে ধন্না দেওয়া, পীরের দরগায় সিন্নি মানা ও অলৌকিক তুত্তা মন্ত্রে ও ঔষধে বিশ্বাস করা মাতৃত্বের অন্ধ আবেগের ক্রিয়া।

মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা প্রভৃতিতে লােকজীবনের নানান সংস্কার বিশ্বাস-এর পরিচয় রয়েছে।

কৃষক জীবনের কৃষি সংস্কৃতি, জাতিগত সম্প্রীতি, উৎসব-অনুষ্ঠান, লােকাচার, বিশ্বাস-সংস্কার গীতিকাগুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি লােকজীবনের বিশেষ পরিচয়কে তুলে ধরে। এই সূত্রেই লােকনাট্যের আগমন। যেমন, সাঁওতাল রমণীরা পরস্পর হাত ধরে একসঙ্গে মাদলের তালে দুলতে দুলতে গান গায়।

গাজনের উৎসবে হরগৌরী সেজে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাদের নাচ দেখায়। এভাবে বুড়ােবুড়ি নৃত্য, কাঠিনাচ, বাউলগানের নাচ অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতির অঙ্গ।

লিখন বা অঙ্কনকেন্দ্রিক লােকসংস্কৃতি

বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে আল্পনা, দেওয়াল চিত্র, মাটিতে বিভিন্ন রকমের চক্রের অংকন, মাটির ঘট বা সরার উপর নানা ধরনের অঙ্কিত চিত্র, পটচিত্র, কাঁথা ও রুমালে অঙ্কিত বহু বিচিত্র নকশা, কাঠের উপর খােদিত নানান কারুকার্য থেকে লােক-সংস্কৃতির একটা চেহারা চিনে নেওয়া যায়। বাংলার প্রাচীন শিল্প হল পটুয়া শিল্প।

পটুয়ারা নানা ধরনের পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করে পট আঁকতেন এবং সেইসব পট দেখিয়ে গান করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

Read More:  রচনা লেখ : পিতা মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

তাছাড়া হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবতা হওয়ায় মাটির দেবদেবী মূর্তি নির্মাণের কারুকার্যের মধ্যে লােকসংস্কৃতির একটি ধারা প্রবহমান।

উপসংহার

সুতরাং বহুদিন ধরে আমাদের লােকসমাজে প্রচলিত লােকসংস্কৃতির ধারা বাংলায় ও বাংলার বাইরে ছড়িয়ে রয়েছে। বাণিজ্যিকরণের চাপে পড়ে এইসব সংস্কৃতি অনেকটাই লুপ্ত বা বিবর্তিত হয়ে চলেছে।

তাই সকলের উচিত সেই প্রাচীন সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করা।