বন্ধুত্বের গুরুত্ব রচনা

ভূমিকা

বিশ্বায়ন-উত্তর কালে মানুষের মৌল চিত্তবৃত্তি যেমন মায়া, মমতা, ত্যাগ, ভালবাসা, আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব প্রভৃতির স্বরূপ যেমন বিবর্তিত হয়েছে তেমনি দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা।

বন্ধুত্বের গুরুত্ব রচনা

মানুষ যখন যাযাবর বৃত্তি ছেড়ে সমাজ গড়ল তখন সামাজিক প্রয়ােজনে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার কারণে মানুষে মানুষে সম্পর্কের বন্ধনকে উপলব্ধি করল এবং তা টিকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে নিয়ােজিত করল।

কিন্তু পৃথিবীর বিবর্তনের সূত্রে সেই সম্পর্কের বন্ধনের মধ্যে দেখা দিল যান্ত্রিক যুগের কৃত্রিমতা। ফলে বন্ধুত্বও কৃত্রিম হয়ে গেল।

বন্ধুত্ব কী

উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, কারাগারে, শ্মশানে যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সেই প্রকৃত বন্ধু। আর বন্ধুর ভাবকে বলে বন্ধুত্ব, সখ্য, সৌহার্দ্য, মিত্রতা, মৈত্রী প্রভৃতি।

বন্ধুত্বের প্রধান সূত্র হল সংকোচশূন্যতা এবং একে অপরের সুখে ও দুঃখে সহমর্মী হওয়া। তাই সহমর্মিতা বা সহানুভূতি বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়।

গুরুত্ব

ভারতীয় জীবনচর্যা ও ঐতিহ্যে বন্ধু ও আত্মীয়ের স্থান অনেক উচ্চ। কেননা মানুষে মানুষে সম্পৰ্কবন্ধনের যে উয়তা তাতে রয়েছে পারস্পরিক বােঝাপড়া, হৃদ্যতা ও নৈকট্য।

সেজন্য মানুষে মানুষে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেরি হয় না।

একজন মানুষ তাই বিপদে আপদে সুখে দুঃখে একজন বন্ধুকে বেশি করেই খোঁজে। খোঁজে এই কারণেই যে, সে এই বিপদের দিনে বা সুখের দিনে তার সঙ্গে  থাকবে এবং দুঃখ-সুখকে ভাগ করে নেবে।

ভাগ করে ভােগ করার মধ্যে যে আনন্দ-সেই আনন্দের শরিক হয় বন্ধু। বন্ধুত্ব তাই মানুষের কাছে একান্ত কাম্য হয়ে ওঠে।

বন্ধুত্বের শুরু

সাধারণত একটি শিশুর জীবনে তার প্রথম বন্ধু হয়ে ওঠে তার স্কুলে। স্কুলে তো আমরা শিক্ষার অর্জনের জন্যে গিয়ে থাকি, কিন্তু শিক্ষার সাথে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা গড়ে ওঠে।

Read More:  একটি বেকার যুবকের আত্মকথা রচনা

এছাড়াও টিফিনের সময় স্কুলে সকল বন্ধুরা মিলে খাবার ভাগ করে খাওয়া তও আমাদের জীবনের একটি বড় শিক্ষা। ছোটবেলায় আমরা সাধারণত বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতাম না।

এরপর কিছু বন্ধুর সঙ্গে আমাদের সারাজীবনের জন্যে সম্পর্ক থেকে যেত কিন্তু কিছু বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যেত। কারন স্কুলের পরে সবার কলেজ তো আর এক হত না।

বন্ধুত্বের আরও একটি মিষ্টি দিক হল ভালোবাসা ও প্রেম। কারণ এই ভালোবাসার মধ্যে দিয়েই অনেকে তাদের জীবনসাথীকে খুঁজে পায়। বন্ধুত্বের এমন একটি জিনিস যার মধ্যে কোনো ভয় ভীতি নেই।

আমরা সব কথা সামনের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। আর এর সঙ্গেই অনেকের মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সুবিধা

বন্ধুত্ব একজন মানুষকে অপরের কাছে নিয়ে যেতে বা নিজেকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। এই প্রকাশের মধ্যেই রয়েছে আনন্দ।

মানুষ যখন একাকী, নিঃসঙ্গ সে তখন একজন বন্ধু খোঁজে তার নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য। একজন ভাল বন্ধুই পারে তার সহমর্মিতা দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার নিঃসঙ্গতাকে দূর করতে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন মানুষ বড় একাকী, ক্ষুদ্র; কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে সে হতে পারে উন্মুক্ত ও উদার।

অর্থাৎ একজন ভাল বন্ধুর সান্নিধ্যে এসে একজনের  মনের সংকীর্ণতা ও অন্ধকার দূর হতে পারে, জ্বলে উঠতে পারে জ্ঞানের আলাে এবং মনের নিভৃতকোণের প্রকাশও ঘটে সেই সূত্রে।

তৃতীয়ত, নিজেকে জানবার জন্য কিম্বা অপরের কাছে নিজেকে মেলে ধরবার জন্য চাই বন্ধুত্বের সূত্র। বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই একজন মানুষের মনের কোণে থাকা ব্যথা-বেদনা, কিম্বা অনুভূতি উজাড় করা সম্ভব হয়।

চতুর্থত, ঘরকন্নার বিষয় হােক, জানা-অজানার বিষয় তােক যে কোনাে ক্ষেত্রেই একজন মানুষের কাছে বন্ধুত্ব হল মাধ্যম যার দ্বারা অনেক অজানা বা জ্ঞাতব্য বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

পঞ্চমত, প্রকৃত বন্ধুই পারে আর একজনের চলার পথকে সুগম করতে ও বাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।

Read More:  খেলার মাঠের আকর্ষণ সম্পর্কে একটি রচনা

অসুবিধা

সব ব্যাপারের মতােই বন্ধুত্বের সুবিধার মতাে অসুবিধাও রয়েছে। কথায় আছে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।

এমনকি বৌদ্ধদের যে অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা বলা হয়েছে তাতেও সৎসঙ্গের কথা বলা হয়েছে।

বন্ধুত্ব যদি সততার ভিত্তিতে না হয়ে প্রয়ােজনের নিরিখে বা কিছু ভ্রান্তির কারণে হয় তবে তার অহিতকর দিকটি মােটেই সুখকর হয় না। বর্তমানে বন্ধুত্বেরও বিশ্বায়ন ঘটেছে।

তাই ফেসবুকের মতাে সােস্যাল মিডিয়াতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে অনেকেই নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে।

তাছাড়া বন্ধুত্ব এখন শুধু লাভ-ক্ষতির অঙ্কে নির্ধারিত হয়, বন্ধুত্ব থাকে সুখের দিনে কিন্তু দুঃখের দিনে তা হামাগুড়ি দিয়ে পালায়।

এমনকি বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই নানান অপকীর্তির সৃষ্টি ও পথভ্রষ্ট হওয়ার ব্যাপারটিও লক্ষ করা যাচ্ছে।

উপসংহার

আসলে এজন্য বন্ধুত্বকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, বন্ধুত্ব করা সহজ কিন্তু বন্ধুত্ব রক্ষা করা সুকঠিন।

তাই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেই চলবে, কিম্বা যখন তখন বন্ধুত্ব করলে বা কোনাে কিছু যাচাই না করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলে কাজের কাজ হবে না, বরং বন্ধুত্বকে সজীব ও সতেজ রাখার জন্য চাই উপযুক্ত মানসিকতা ও পদক্ষেপ।