বই পড়া হল শ্রেষ্ঠ বিনোদন রচনা লেখ

ভূমিকা

বই পড়া শুধু শিক্ষার জন্য নয়, সৎ সঙ্গের জন্য তা জরুরি। আধুনিক কালে যদিও কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের প্রসার ঘটার ফলে বই পড়ার চাহিদা কিছুটা কমেছে তবুও বই পড়ার কোনাে বিকল্প নেই। সময় কাটানাের জন্য, নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য এবং মানসিক আনন্দলাভের জন্য বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। জ্ঞান ও ভাবের রত্নভাণ্ডার বই। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ত্রিবেণীসংগম ঘটেছে বই-এর মধ্যে। হৃদয়ের তৃস্না ও ভাব-সম্পদের মনীষার সাধনক্ষেত্র।

নিরক্ষরকে অন্ধকার থেকে আলােয় উত্তরিত করা। জাতীয় ঐতিহ্যকে, তার আত্মপরিচয়কে সম্যকভাবে সার্বজনীন করার সহায়ক বই। ‘বেদ’-এর মধ্য দিয়ে যার পথ চলা শুরু জনগণকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব বই-এর ওপরেই।

বইপড়া ও কাব্যচর্চা

তাই প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন-বীণা ও পুস্তক দুই সরস্বতীর দান হলেও ও-দুই গ্রহণ করবার সমান শক্তি এক দেহে প্রায় থাকে না। বীণাবাদন বিশেষ সাধনাসাধ্য, পুস্তকপঠন অপেক্ষাকৃত ঢের সহজ। আধুনিককালে যান্ত্রিকতা যতই মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে ততই বই পড়া তথা কাব্যচর্চার গুরুত্ব বাড়ছে। কাব্যচর্চা না করলে, বই না পড়লে মানুষ তার জীবনে একটা বড়াে আনন্দ থেকে বিচ্যুত হয়।

অথচ বই পড়ার মধ্যে যে আনন্দের ভাণ্ডার রয়েছে, তা সর্বসাধারণের ভােগের জন্য সতি রয়েছে। আনন্দলাভ সব মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত, তাই বই পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, তা যারা পাঠ করে তারাই উপলব্দি করতে পারে।

বই ও বিনােদন

মানুষের জীবন কর্মময়। কিন্তু অবসরও কম নয়। এই অবসর সময়কে অপব্যবহার না করে, বৃথা ব্যয় না করে; বইপড়ার মাধ্যমে নির্বাহ করার মধ্যে তার সার্থকতা। জীবনের সময় সীমিত, কিন্তু জানার পরিধি অপরিসীম। প্রাত্যহিক জরুরি ও অতিপ্রয়ােজনীয়, কার্য সম্পাদন যেমন আবশ্যিক, তেমনি জ্ঞানাহরণও অবশ্য কর্তব্য এই পাঠাভ্যাসকে নিয়মিত চর্চার মধ্যে নিবদ্ধ রাখতে পারলে বিনােদন ও জ্ঞানার্জন দুই-ই সমানভাবে চলতে পারে।

বইপড়া ও সভ্যতা

কোনাে কোনাে সমালােচক মনে করেন, যে জাতির যত বেশি লােক, যত বেশি বই পড়ে, সে জাতি যে তত সভ্য, এমন কথা বলা বােধ হয় অন্যায় নয়। পরনিন্দা, পরচর্চা, দ্বেষ-হিংসা না করে কেউ যদি বই পড়ে তাহলে তার আত্মিক উন্নতি ঘটে।  হিন্দুযুগে বই পড়াটা নাগরিকদের মধ্যে একটা মস্ত বড়াে ফ্যাসান ছিল। ইউরােপের সভ্য সমাজেও দেখা যায়, বই পড়া সে সমাজের সভ্যদের ফ্যাসনের একটি প্রধান অঙ্গ।

সেজন্য প্যারিসের নাগরিকরা আনাতােল ফ্রঁসের টাটকা বই পড়েন নি-একথা বলতে লজ্জিত হতেন। কিম্বা রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর বই পড়েননি-একথা বলতে লজ্জিত হতেন ইংল্যাণ্ডের সভ্য নাগরিকরা। সভ্যতা বলতে যদি উন্নত মানবসমাজের বহিরঙ্গ রূপকে বােঝান হয়, তবে সেই সভ্যতার অন্যতম উপাদান হল বই পড়া তথা কাব্যচর্চা।

বই জ্ঞানভাণ্ডার

দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় এই বই-ভান্ডারে নিহিত থাকে। বিভিন্ন রুচির মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে আসক্ত। বই-এর মধ্যে সব জ্ঞানপিপাসার সুধারস যেমন নিহিত তেমনি তা মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়ক।  তাই বইকে এককথায় বহুমুখী জ্ঞানের ভাণ্ডার বলা যায়। বই আনন্দবিকাশ ও সমস্যা সমাধানের উপকরণ : শরীরকে পুষ্ট রাখতে, নীরােগ রাখতে যেমন উপযুক্ত খাদ্য ও সুষম আহারের প্রয়ােজন, তেমনি মনের আনন্দবর্ধনের জন্য দরকার বই।

মানসিক অবসাদ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ভালাে বই যথেষ্ট সহায়ক। জটিল পরিবেশ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য মানুষ যখন সমাধানের পথ খোঁজে। তখন বই-এর মধ্যে লেখকের সুচিন্তিত মতামত তাকে সমস্যার কুহকজাল থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।

বইপড়া ও সখ

আমাদের পৃথিবীতে মানুষের বহু শখ আছে এবং শখ মেটাবার উপযুক্ত ক্ষেত্রও আছে। অনেকে শখকে শৌখিন বলেন। কিন্তু আজকাল সবারই কিছু না কিছু শখ রয়েছে। খেলাধুলা, রান্নাবান্না, গল্প-গুজব, বই লেখা ও তা কাউকে পড়ে শােনানাে, গান-বাজনা করা, বাগানে ফুল চাষ করা ইত্যাদি নানান শখ মানুষের মধ্যে দেখা যায়।

তবে একথাও ঠিক যে, আমাদের মতাে দেশে জীবনধারণ করাই যখন প্রধান সমস্যা তখন সেখানে মানুষের শখের আলােচনা করা তথা বই পড়াকে শখ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা কতজনের থাকবে তাতে সন্দেহ আছে।

বিনােদনের মাধ্যম

আমাদের দেশ এখনও সাক্ষরতার দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। সার্বিক সাক্ষরতা প্রসারে বই-ই একমাত্র মাধ্যম। পরিস্থিতির চাপে, গরিব, নিঃস্ব মানুষ অবদমিত জ্ঞানাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে নিস্তেজ করে রাখে। উপযুক্ত পরিবেশ ও অনুকূল পরিস্থিতির সহায়তা পেলে এইসব মানুষ তাদের কামনা বাসনাকে চরিতার্থ করতে সক্ষম হয়।

গল্পের বইয়ের গুরুত্ব

গল্পের বই হল আনন্দ সুধা, যা পান করলে মন হয় উন্মুক্ত। পুঁথিগত বিদ্যার একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে অতি আবশ্যক গল্পের বই। গল্পের বই আমাদের কল্পনাশক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। যে কল্পনাশক্তির দ্বারা একজন ডাক্তার রােগীর নার্ভ দেখে ধারণা করতে পারে রােগের প্রকৃতি, কিম্বা একজন ইঞ্জিনিয়ার সেই কল্পনাশক্তির সাহায্যে এককাঠা জায়গায় তিনতলা বাড়ি নির্মাণের প্ল্যান দিতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের গল্পের বই তাে এককালের সমাজের নানান চিত্র, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে উজ্জ্বল করে তোলে। ফেলুদার মতাে গােয়েন্দা বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকে রােমাঞ্চের রস যা আমাদের আত্মবিভাের করে তােলে। কৌতুক রসাশিত গল্প আমাদের মনে আনন্দের জোয়ার আনে।

তাত্ত্বিক বিদ্যা যেমন প্রয়ােজনীয় তেমনি অতি আবশ্যক গল্পের বই যা মানুষকে সমাজ-সচেতন করে ও মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারকে স্ফীত থেকে স্ফীততর করতে সাহায্য করে। ঈশপস্ ফেবলস থেকে আরম্ভ করে কথামালা, গল্পগুচ্ছ থেকে আরম্ভ করে ঘনাদা, ফেলুদা, ব্যোমকেশ বকশির গল্প যে কোনাে শিক্ষার্থীকে আকর্ষণ করে।

অথচ শিক্ষার্থীর হাতে গল্পের বই থাকলে অভিভাবকরা ছোঁ মেরে টেনে নেয়। কেননা তারা মনে করেন, পড়ার বই-র বাইরে গল্পের বই পড়া শুধু সময় নষ্ট করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পড়াশােনার ভিতকে মজবুত করতে গেলে চাই স্বাধীন পাঠ-যা মুক্ত আনন্দ দিতে পারে। এই মুক্ত আনন্দ ছাড়া নিত্য-নৈমিত্তিক পড়াশােনা নীরস প্রাণহীন হয়ে পড়ে।

বইপড়া ও সঙ্গ

নিঃসঙ্গ জীবন মানুষের কাছে অভিশাপ স্বরূপ। সেই নিঃসঙ্গতা আজকের আধুনিক মানুষের নিত্যসঙ্গী। সেই প্রাচীন একান্নবর্তী পরিবারও নেই, নেই সামাজিক শৃঙ্খল। মানুষ স্বার্থপরতার নিগড়ে নিজেকে বেঁধে ফেলে বৃহৎ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর বিচ্ছিন্ন বলেই তাকে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা কুরে কুরে খায়।

সেই নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে বই হতে পারে অন্যতম সঙ্গী। শুধু দূরদর্শনের পর্দায় চোখ রাখলেই সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে যদি পছন্দমতাে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তােলা যায়, তাহলে বই উপযুক্ত সঙ্গী হিসেবে মানুষকে যথেষ্ট আনন্দ দিতে পারে।

বই তার কাছে এমন সঙ্গী হবে যে বায়না ধরে না, যে ঠকায় না, বরং তার মধ্যে থেকে মানুষ সৃষ্টি করে নতুন নতুন উপকরণ-যা তাকে বাঁচবার রসদ জোগায়। বিশেষ করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কাছে বই পড়ার বিকল্প নেই বললেই চলে।

বইপড়া ও শিক্ষা

ধনের ভাণ্ডারকে উৎসাহিত করতে হলে বই পড়া যে জরুরি সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ থাকে না। বই পড়লে কত অজানা তথ্য, নীতিজ্ঞান, বাস্তবজ্ঞান, আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। এমনকি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু বন্ধন রচনা করে বই পড়া।

অতীতকালের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান জীবনের নানা রসদ এবং আগামী দিনের পথ পরিক্রমার ভবিতব্য নির্ণীত হয় বই পাঠের মাধ্যমে। বিশেষ করে স্বাধীন পাঠ কল্পনাবৃত্তির প্রসার ঘটায়। এই কল্পনাবৃত্তি জীবনে বাঁচার ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়ােজনীয়।

গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার

প্রয়ােজনীয় ও দুষ্প্রাপ্য দুর্মূল্য বইকে উপযুক্তভাবে সংরক্ষণে গ্রন্থাগারের বিশেষ ভূমিকা আছে। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনন্ত জ্ঞানপ্রবাহের যে শ্রোতধারা নিত্য বহমান তার স্বাদ একমাত্র এই গ্রন্থাগার দিতে পারে। উচ্চশিক্ষা থেকে গবেষণা এমনকি সাক্ষরতা সহায়ক বই-এর বিপুল সম্ভার থাকে এখানে। জ্ঞানের কৌতূহল নিবৃত্তিতে যেমন এর প্রয়ােজন তেমনি বিনােদনের শ্রীক্ষেত্রও হল লাইব্রেরি।

উপসংহার

বাস্তবিক কথা হল, আমরা নিজেদেরকে সভ্য নাগরিক বলে প্রতিপন্ন করতে চাই, বইও শৌখিন আলমারিতে সাজিয়ে রাখি, কিন্তু বই সেভাবে পড়ে নিজেদেরকে সংস্কৃতিমনস্ক করে গড়ে তােলায় আমরা নিরানন্দ অনুভব করি।

পরিশ্রম করে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, কিন্তু তা আমরা খুব একটা করি না। সেই কারণে বাহ্যিক দিক থেকে আমরা সভ্য হলেও অন্তরে আমরা দেউলিয়া হয়ে পড়েছি। সেই দেউলিয়া মনােভাব সরিয়ে বই পড়াকে সঙ্গ ও শিক্ষা উভয় দিক থেকে গ্রহণ করলে ব্যক্তি ও জাতির উন্নতি অনেকটাই সম্ভব হতে পারে।

‘বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি’- এই আপ্তবাক্যে জ্ঞান-পিপাসার তীব্রতার কথাই বলা হয়েছে। একটি বই যা বাড়িতে বা গ্রন্থাগারে সহজল তা একাধারে শিক্ষাবিস্তার, বিনােদন, জ্ঞান-পিপাসা নিবারণে সক্ষম।

আধুনিক যুগে বই-এর বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিন নানা মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বই-এর পরিপূরক হিসেবে তা কখনও গ্রহণযােগ্য নয়। তাই বই একমাত্র শ্রেষ্ঠ বিনােদন মাধ্যম।