বইমেলায় একটি সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা রচনা লেখ

ভূমিকা

কলকাতার এই বইমেলা পূর্ব কলকাতায় বাইপাসের ধারে স্থায়ী মেলা প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হওয়ায় নতুন পরিবেশে বইমেলার সেই রমণীয় স্মৃতিবিধুর সন্ধ্যা আমার স্মৃতিপটে উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে।

তা কখনাে ভােলা যাবে না।

বইমেলায় একটি সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা

স্মৃতিচারণ

স্মৃতি সততই সুখের-যদি তা অনিষ্টকর না হয়। এই স্মৃতিচারণার মধ্যে আমরা নিজেকে নতুন করে পাই, ভুলতে চাই বর্তমানের বেদনা। এই স্মৃতিচর্বণ মানুষকে উদ্দীপিত করে, অনুপ্রেরণা জাগায়।

মনও একটা আমেজে ভরপুর হয়ে ওঠে। এমনই এক স্মৃতিমেদুর ঘটনা হল গতবারের বইমেলার সন্ধ্যা।

মেলার বর্ণনা

মেলায় যখন পৌছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। বিরাট লাইন। তবে কোন প্রবেশ মূল্য নেই। শীতের দিন।

মাঠে ঘাসের রাজ্যেও ধুলাে উড়ছে। খানিকটা এগােতেই দেখি টিন দিয়ে ঘেরা এক বিরাট জায়গা। সামনে বিরাট গেট। জন-অরণ্য।

সারিবদ্ধভাবে সবাই ঢুকছে কোন ঠেলাঠেলি নেই।

মনে হল, সাবাস কলকাতা! এখানকার মানুষ ইস্টবেঙ্গল-মােহনবাগান-মহামেডান-এর খেলা কিম্বা ইডেনে ক্রিকেট খেলা দেখতেই শুধু জানে না, রেশনের কিম্বা যে কোনাে টিকিটের লাইনেই দাঁড়াতে জানে না, বইমেলাকে তারিফ করতেও জানে।

ওদিকে মাইকে সানাই-এর সুর। বুঝি বেহাগ। মনটা কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল।

কেননা সামান্য ক’টা টাকা নিয়ে এসে কী বই-বা কেনা যায়? মনকে প্রবােধ দিলাম, বােঝালাম একবার, বইমেলায় যাওয়াটা সাগর দর্শনের মতাে।

টাকা থাকলেই কি আর সাগর কেনা যায়? না, সাগরের সব জলকে আটকে রাখা যায়? গঙ্গাসাগর যাত্রীর মতাে জলের ছিটেফোঁটা আনলেও কি কম পরিতৃপ্তি? আকাশ-পাতাল আরও কত কী ভাবছিলাম।

মেলার ভেতরে ঢুকে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মনে হল, এ কোথায় এলাম। আমার আশেপাশে চারিদিকে শুধু স্টল, বই আর বই। মেলা প্রাঙ্গণে যেন জমাট উৎসব।

কোথাও কাগজের ঝালর, কোথাও আম্রপল্লব ও ফুলের মালা।

ভরসন্ধ্যায় এই বুঝি দেবারতি শুরু হবে। রঙ-বেরঙের কত আলাে চারিদিকে! কী রােশনাই! আলােয়, সুরে, বর্ণে মিলেমিশে কী অপরূপ পরিবেশ! প্রথমে কোনাে স্টলেই ঢুকলাম না। ঘুরে ঘুরে দেখলাম শুধু।

ভারতের নানা জায়গা থেকে প্রকাশকরা এসেছেন; যদিও কলকাতার সংস্থারাই মেলার সিংহভাগ জুড়ে। বিদেশি প্রকাশক সংস্থাও দু-একটি চোখে পড়ল।

সকলের আগে মন কেড়ে নিল বাংলাদেশ। সেখানে ঢুকে দেখি অদ্ভুত দৃশ্য! নদী, নৌকো, পাটখেত ও খালবিলের কয়েকটি ছবিকে ঘিরে, বয়ে নিয়ে এলাে বাংলাদেশের সুবাস।

বই দেখে মন যেন জুড়িয়ে গেল। কী আশ্চর্য! লােকসংগীত সংগ্রহে, সরকারি কাজকর্মে, পরিভাষা প্রণয়নে, মাতৃভাষা ব্যবহারে আমাদের থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।

সেখান থেকে গেলাম মূল মঞে। সেই সন্ধ্যায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অনেক গণ্যমান্য অতিথি। ভাবতেও পারিনি এঁদের এত কাছ থেকে দেখতে পাব।

উপস্থিত ছিলেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কবি শঙ্খ ঘােষ, কথাসাহিত্যিক দিব্যেন্দু পালিত, রম্যরচনাকার সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে।

এঁদের বক্তব্য শুনে অনুপ্রেরণা পেলাম। বইমেলাতে এসে এই রমণীয় সন্ধ্যায় জ্ঞানীগুণীদের দেখে অভিভূত হলাম।

মঞ্চ থেকে গেলাম বই-এর স্টলে। দিল্লির এক প্রকাশকের কাছ থেকে স্পােকেন ইংলিশ বই কিনলাম। এরা সস্তায় সুন্দর সুন্দর বই প্রকাশ করছেন।

এর বিপরীত দিকে আর্কিয়ােলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার স্টল। ওখান থেকে কিনলাম ভারতের বিভিন্ন অঞলের পথের কয়েকটি মানচিত্র। এবার চেনাজানা বাংলা বইয়ের স্টলে।

দেখে খারাপ লাগল, কেননা এসব স্টলে রসিকদের তুলনায় হিড়িকপ্রবণদেরই ভীড়। অতি তুচ্ছ ডিটেকটিভ বই কেনার জন্যও অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ আবার এমনভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন, যেন বিয়েবাড়ি; আর ওঁরা কর্মকর্তা।

উপসংহার

বইমেলায় সেই সন্ধ্যায় কিছু মজার ব্যাপারও দেখলাম। যেমন, কোনাে কোনাে লেখক নিজেই নিজের বই বিক্রি করছেন, ক্রেতারা চাইলেই নিজের দস্তখত করে দিচ্ছেন।

কোনাে কোনাে স্টলে বই কিনলে হেমন্ত মুখােপাধ্যায়ের একটি গানের ক্যাসেট ফ্রি দেওয়া হচ্ছে।

এগুলাে দেখতে দেখতে আর চনতে চলতে রাত নটা বেজে গেল। বাড়ি ফেরার পালা।

বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না কিন্তু ৯:৩০-এ শেষ বাস। তাই তা না ধরতে পারলে বাড়ি ফিরতে পারব না। একটা সন্ধ্যা কী আর মনের খােরাক মেটাতে পারে? সেই অপূর্ণতা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

কিন্তু সারাটা রাত আমার ঘুম এলাে না, কেবলই মনে হতে থাকল সন্ধ্যার ঘটনাগুলি। নিজেকে খুব শান্ত লাগছিল, মনে হচ্ছিল সেই সন্ধ্যায় বইমেলা দেখা যেন, এ জন্মের তীর্থদর্শন।