নারিকেল গাছ বিষয়ে প্রবন্ধ-রচনা

সূচনা

নারিকেল গাছ আমাদের একটি প্রধান সম্পদ। এই বৃক্ষ থেকে আমরা উপকার ছাড়া অপকার পাই না। ইহা তাল জাতীয় বৃক্ষ। সমুদ্রতীরে অথবা বাগানে নারিকেল বৃক্ষের সারির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব।

নারিকেল বৃক্ষের পাতার মধ্যে যখন সূর্যের কিরণ অথবা চন্দ্রের কিরণ পড়ে তখন দেখতে খুব সুন্দর লাগে।

জন্মস্থান

ভারতবর্ষের সমুদ্র উপকুলগুলিতেই প্রচুর নারিকেল গাছ জন্মায়। চব্বিশ পরগণা, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ এবং কেরালাতে প্রচুর নারিকেল হয়।

ইহা ছাড়া সিংহল, পাকিস্তানের যশােহর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, নােয়াখালি, প্রশান্তমহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপে, আমেরিকার এবং সুমাত্রা জাভা প্রভৃতি জায়গায় নারিকেল বৃক্ষ হয়।

সাধারণ বর্ণনা

নারিকেল গাছ প্রায় ৫০/৬০ হাত পর্যন্ত লম্বা হয়। ইহার কোন শাখা-প্রশাখা নাই, সরলভাবে বর্জিত হয়। তাল গাছের মত এত মােটা হয় না। মাথা থেকে লম্বা লম্বা পাতা বার হয় দূর হতে এটিকে একটি ছাতার মত মনে হয়।

গাছের মূলে ছােট ছােট অনেক শিকড় থাকে। গাছের আগায় নারিকেলের কঁদি বের  হয়।

প্রত্যেক কাদিতে ৫০ থেকে ৬০টি পর্যন্ত নারিকেল হয়। নারিকেলের ছােট ছােট গুটিগুলিকে এক একটি কাঠের গুটির মত মনে হয়। তখন ইহার মধ্যে কিছু থাকে না।

পরে যখন গুটিগুলি বড় হয় তখন তার মধ্যে থাকে জল। এই জল অতি সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং বেশীর পক্ষে খুবই উপকারী। নারিকেলের এই অবস্থাকে বলে ‘ডাব’।

ডাব যখন পেকে ঝুনা হয়ে যায় তখন তাকে বলে ‘ঝুনা নারিকেল’।

ইহার মধ্যে জলও থাকে, আবার অতি সুস্বাদু নারিকেলের শাঁসও থাকে। নারিকেলের আবরণ দুটি বাহিরের আবরণকে বলে ‘ছােবড়া’, ভিতরের আবরণকে বলে ‘মালা’। নারিকেল গাছে বৎসরে ৩৪ বার ফল ধরে।

উপাদান প্রণালী

লবণাক্ত মাটিতেই নারিকেল গাছ ভাল হয়ে থাকে। একটি পাকা ঝুনা নারিকেল যে কোন ঠাণ্ডা জায়গায় মাটিতে পুতে রাখলে উহা হতে অঙ্কুর বের হয়।

Read More:  সমাজ জীবনে মেলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

তখন কেবল মাত্র কয়েকটি পাতা বের হয়, ঐ পাতা ক্রমশঃ গাছের আকার ধারণ করে। গাছ যখন সামান্য বড় হয় তখন ঝুনা নারিকেলটির উপরের খােসা ভেদ করে  শিকড় বের হয়ে গুড়ি বড় হতে থাকে।

ঐ চারাগাছটিকে ঐখান হতে তুলে অন্যত্র গর্ত করে পুতে দিতে হয়। পাঁচ ছয় বৎসরের মধ্যে গাছে ফল ধরে। অন্যান্য চাষের মত নারিকেল চাষে কোন খরচ নেই বললেই চলে।

কোন রকমে গাছটিকে বেঁচে রাখতে পারলে দীর্ঘদিন আর ইহার জন্য কোন খরচ করতেই হয় না। এত অল্প পরিশ্রমে অন্য কোন চাষ হয় না। কিন্তু ইহার উপকারের শেষ নেই।

উপকারিতা

নারিকেলের কোন অংশই ফেলা যায় না। তাই ইহাকে সম্ভবত ‘কল্পবৃক্ষ বলা হইয়া থাকে। ডাবের সুস্বাদু জল যেমন আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে তেমনি রােগীর পক্ষেও ইহা খুব উপকারী।

পেটের রােগ, সর্দি, কাশি ইত্যাদিতে ডাবের জল ব্যবহৃত হয়। নারিকেলের শাঁস অত্যন্ত সুমিষ্ট, ইহা পুষ্টিকরও বটে। নারিকেল থেকে নানা রকম মুখরােচক মিষ্টান্ন প্রস্তুত হয়েথাকে।

নারিকেল থেকে উৎকৃষ্ট তৈল হয়।

পূর্বভারতের লােকেরা নারিকেল তেল মাখিয়া থাকে কিন্তু দক্ষিণ ভারতে এই তৈল তরকারীতে ব্যবহৃত হয়। আজকাল বাজারে যে নানারকম গন্ধ তৈল পাওয়া যায় সেটাও নারিকেল তৈল থেকেই প্রস্তুত নারিকেলের বাহিরের আবরণ ছােবড়া থেকে দড়ি, জাহাজের কাছি, গদি, পাপােষ, কার্পেট প্রভৃতি তৈরী হয়।

তৈরী হয় নানারকম শৌখিন জিনিষও। ইহার পাতাও আমাদের অনেক কাজে লাগে, দরিদ্র লােকেরা নারিকেল পাতায় ঘর ছাউনি করে, সেটি  হতে ঠোঙা, ব্যাগ প্রভৃতিও তৈরী করা যায়।

তাছাড়া শুকনাে পাতা ও নারিকেলের কাদির অন্যান্য জিনিয় খুব ভাল জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। নারিকেল পাতার শিরায় খুব ভাল ঝাঁটা হয়। নারিকেল গাছ পুরানাে হলে আর ফল দেয় না।

ভখন ইহার কাঠ খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঠ দেখতেও বেশ সুন্দর। ডাব নারিকেল হিন্দুদের পূজাপার্বণে মাঙ্গলিক চিহ্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

Read More:  তোমার প্রিয় বাংলা ভাষার লেখক - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা

উপসংহার

নারিকেলের জল ও শসের উল্লেখ করিয়া প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল বলিয়াছেন, “বাঙলাদেশে এক প্রকার ফল হয়, তাহা ঈশ্বরের আশ্চর্য সৃষ্টি ; ইহাতে এক পেয়ালা সরবৎ ও দুইখানি রুটি থাকে।”

নারিকেল আমাদের অন্ন ও পানীয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়। নারিকেল থেকে আয়ুর্বেদীয় ঔষধও প্রস্তুত হয়ে থাকে।

আয়ুর্বেদে নারিকেলী খণ্ড’ এক বিখ্যাত ঔষধ। কেরালা প্রভৃতি রাজ্যে নারিকেল থেকে প্রচুর বিদেশীমুদ্রা অর্জন হয়।

নারিকেলের ব্যবসাও খুব লাভজনক। ৫০/৬০টি নারিকেল গাছ থাকলে একজন গৃহস্থের অনায়াসেই সংসার চলে যায়। তাই এটি আমাদের প্রধান সম্পদ।