ধান গাছ নিয়ে একটি রচনা লেখ

সূচনা

বাংলার প্রধান শস্য ধান, বাঙালীর প্রধান খাদ্য ভাত। তাই ধান না হইলে শুধুমাত্র বাঙালীই নয়, ভারতবাসীও ইহার অভাবে- হাহাকার করে। এমন একদিন ছিল যেদিন বাঙালীর ঘরে ঘরে ‘মাচা ভরা ধনি’ ছিল।

আমাদের জীবনে ধানের প্রয়ােজন এত বেশি যে এই তৃণজাতীয় উদ্ভিদটি আমাদের ভাবকল্পনায়ও পর্যন্ত স্থানলাভ করেছে।

জন্মস্থান

ভারতবর্ষের প্রায় সব জায়গাতেই ধান জন্মে থাকে। বিশেষ করে বাঙলা, উড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতি প্রদেশে প্রচুর ধান্য জন্মিয়া থাকে।

ইহা ছাড়া পূর্বপাকিস্তান, ব্ৰহ্মদেশ, শ্যাম দেশ, চীন, জাপান, মিশর প্রভৃতি দেশেও প্রচুর ধান জন্মে। ভাত চীনা এবং জাপানীদের অন্যতম প্রধান খাদ্য। ইউরােপে স্পেন ও ইটালিতে।

এবং আমেরিকাতেও প্রচুর ধান্য জন্মে। তবে মৌসুমী বায়ু যেসব দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত করায় সেই সব দেশেই প্রচুর ধান্য জন্মে।

প্রকারভেদ

ধান নানা রকমের আছে। বােরাে, পানিকলস, বাসমতী, দুগ্ধেস্বর, শােলাকোট, জংলী, লাদু প্রভৃতি নানা রকমের ধানের চাষ আমাদের দেশে হয়।

সম্প্রতি আমাদের দেশে খাদ্যাভাবের দরুন উন্নতজাতের নানারকম ধানের চাষ আমাদের দেশে হয়েছে এই সব জাতের ধানের প্রধান গুণ হল অল্প জমিতে প্রচুর ধান্য ফলে।

তাইনান, তাইচুং, এন. সি ১২৮০ প্রভৃতি ধান এই শ্রেণীর। তবে ফসল পাকার সময় অনুসারে ধানকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়- আশু বা আউস, হৈমন্তিক বা আমন ধান্য এবং বােরাে।

আউশ ধান উচু জমিতে হয়, বৈশাখ মাসে ইহার বীজ বপন করতে হয় এবং ভাদ্র আশ্বিন মাসে ফসল কাটা হয়। আমন ধান আষাঢ় শ্রাবণ মাসে রােপণ করা হয়, অগ্রহায়ণ পৌষমাসে ধান গাছ শুকিয়ে গেলে ইহা কাটা হয়।

আমাদের দেশে আমন ধানের চাষই বেশী হয়ে থাকে। বােরাে ধানের জন্য জলের বেশী প্রয়োজন হয় না-জলাভূমিতে ইহাকে রােপণ করা হয়। পৌষমাসে ইহার বীজ বপন করিতে হয়, বৈশাখ মাসে কাটিয়া ঘরে তুলতে হয়।

চাষের পদ্ধতি

জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় মাসে সামান্য বৃষ্টি হবার পরই আমাদের দেশের কৃষকেরা লাঙ্গল কাঁধে নিয়ে এক জোড়া বলদ সহ চাষ করার জন্য বাহির হয়।

নরম মাটিতে লাঙ্গল করিয়া চাষীরা গােবর, ছাই প্রভৃতি সার মাঠে দেয়।

তাহার পর ধান বুনে। পরে ধান গাছগুলি বড় হলে একদিকে যেমন আগাছাগুলিকে পরিষ্কার করতে হয় অন্য দিকে ঘন ধান গাছগুলি তুলে পাতলা করে দিতে হয়।

পরে শ্রাবণ ভাদ্র মাসে বেণী বৃষ্টি হলে ধান গাছগুলি বেড়ে উঠে। এই প্রক্রিয়াকে আমাদের দেশে বােনা চাষ বলে। এ ছাড়া আরও একরকমে চাষ করা যায়, তাকে রোয়া চাষ বলে।

প্রথমে চাষীরা অল্প কিছু জমিতে চারাগাছ তৈরীর জন্য ধান বােনে। পরে লাঙ্গলকরা অন্য জমিতে ঐ চারাগাছগুলিকে তুলে সুন্দরভাবে পুঁতে ফেলতে হয়।

আধুনিক যুগে লাঙ্গলের পরিবর্তে ট্রাক্টরের মাধ্যমে অতি কম সময়ের মধ্যে জমি লাঙ্গল করা সম্ভব হয়। আজকাল আমাদের দেশে জাপানী প্রথায় চাষও যথেষ্ট হয়েছে।

পরে ধানগাছ বড় হলে শীষ আসে এবং এই শীষ যখন পাকে যায় তখন ধানগাছগুলিও শুকনাে হয়ে যায়।

তখন কৃষকেরা কাস্তের সাহায্যে পৌষমাসের প্রচণ্ড শীতে কাপিতে কাপিতে ধান কাটতে শুরু করে। তখন তাহাদের বুকে কত আশা, অন্ধকারময় ভবিষ্যৎ তাদের কাছে তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

কারণ সােনার ধানে তাদের ঘর ভরে যাবে এবং সারা বৎসরের অন্ন তারা সংগ্রহ করছে। ইহার পরেই হইবে নতুনধনে নবান্ন উৎসব, পৌষ সংক্রান্তিতে ‘পিঠা-পরব’।

রৌদ্রে পুড়িয়া, জলে ভিজিয়া, শীতে কাপিয়া চাষ করিবার দুঃখ কৃষকেরা তখন ভুলে যায়।

উপকারিতা

ধান থেকে চাউল হয়। ধান্য সিদ্ধ করে ও রৌদ্রে শুকিয়ে তার পর ভাঙ্গিলে যে চাউল পাওয়া যায় তাহা ‘সিদ্ধ চাউল। এই চাউলই আমরা সচরাচর ব্যবহার করে থাকি।

ইহা ব্যতীত, ধানকে রৌদ্রে শুকিয়ে ধান ভাঙিয়া যে চাউল পাই তা হল ‘আতর চাউল”।

ইহা খুবই পুষ্টিকর, দেখতে সাদা এবং ইহা আমাদের দেবপূজায় লাগে। ভাতের ফেন মানুষের পক্ষে খুবই পুষ্টিকর।

কুড়া গরুর প্রধান খাদ্য। চাল থেকে যে তুষ বাহির হয় তা আমাদের জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।

খড় যেমন একদিকে আমাদের জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে ইহার দ্বারা ঘরের ছাউনিও হয়। ধান হইতে শুধু ভাতই হয় না। ধান ভাঙ্গিলে খই হয়- ইহা আমাদের প্রিয় খাদ্য।

তাছাড়া চাউল থেকে যে মুড়ি হয় তাহা আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য। নারিকেল সহযােগে চালভাজা খাইতে ভালবাসে না এমন লােক বােধ হয় নাই।

অবশ্য যাহাদের দাঁত নাই তাহারা ইহার জন্য দুঃখ অনুভব করে। ধান থেকে যে চিড়া হয় তাহাও আমাদের প্রিয় খাদ্য। এক কথা ধান না হলে আমরা অর্থাৎ ভারতবাসীরা বেঁচে থাকতে পারি না। ধান থেকে বাঙালীর সব রকম খাদ্যের অভাব মেটানো যায়।

উপসংহার

বাঙালী আজ ‘গোলাভরা ধানের জন্য গর্ব অনুভব করিতে পারে না। কারণ সে রামও নাই, সে অযোধ্যাও নাই।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা ভারতবাসীর জীবনে সম্প্রতি প্রায় লেগেই আছে। তাই যে ভারতবর্ষ একদিন বিশ্বের শস্যভাণ্ডার রূপে বিখ্যাত ছিল, সেই ভারতবর্ষকেই আজ বিশ্বের দুয়ারে দুয়ারে ‘অন্ন দাও’ ‘অন্ন দাও’ বলে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে।

ভারতবাসীর এই সহায়তা দূর করতেই হবে। ইহার জন্য চাই একদিকে যেমন শিক্ষিত চাষী, উন্নত প্রথায় চাষ, শ্রমের প্রতি নিষ্ঠা, অন্যদিকে চাই শুধু সেচ ব্যবস্থা।