দেশ সেবা ও সমাজ কল্যানে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা

ভূমিকা

কবি নজরুল তাঁর ছাত্রদলের গান কবিতায় ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ছাত্রদল চায় বিশ্ববাসীর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে।

আমাদের এই ভারতবর্ষে অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এলেও, দেশের বহু মানুষ জীবনধারণের প্রাথমিক উপাদানগুলি থেকে এখনাে বঞ্চিত।

তাই ছাত্রছাত্রীদের দুর্বার প্রাণশক্তি পারে দেশের মানুষের তথা দেশগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে।

কেননা তাদের মৃত্যুঞ্জয়ী সাহস, কর্মনিষ্ঠা, এগিয়ে চলার গতি ভারতবর্ষের বিভিন্ন সমস্যাকে সমাধানের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারবে।

আমরা শক্তি আমরা বল/আমরা ছাত্রদল। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে গেয়েছিলেন কবি এই ভেবে যে ছাত্ররা দুর্বার প্রাণশক্তির আধার।

তাদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট, হৃদয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী সাহস, কর্মে তাদের নিরলস অবিশ্রাম গতি। দুর্গম গিরি, কান্তার মরু ছাত্রদের কাছে কোনাে বাধা নয়, অফুরন্ত তাদের প্রাণশক্তি।

এই অফুরন্ত প্রাণশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ছাত্ররা যদি লেখাপড়া বজায় রেখেও মানব সেবায়, সমাজের কল্যাণে তথা সমাজগঠনে নিজেদের নিয়ােজিত করে তাহলে দেশ ও জাতির উন্নতি অবধারিত।

দেশ সেবা ও সমাজ কল্যানে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা

ছাত্রদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য

স্বভাব-বৈশিষ্ট্যে ছাত্রছাত্রীরা নব যৌবনের অগ্রদূত, তারা তারুণ্যের প্রতীক।

সেই তারুণ্য কোনাে বাধা-বন্ধ মানে না, কোনাে পিছুটান তাদের নেই, জীবন-মৃত্যু তাদের পায়ের ভৃত্য।

তাদের এই চারিত্রিক সম্পদ দেশের সম্পদ। কেননা আজকের ছাত্রছাত্রী ভবিষ্যতের একজন সুবিবেচক সুনাগরিক।

দারুণ উপপ্লবের দিনে ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসে বলেই তাদের শক্তিকে ছােটো করে দেখা যায় না।

স্বভাবে বন্ধনহীনতা, চরিত্রধর্মে এগিয়ে চলা, প্রথা ও কুসংস্কারের জগদ্দল পাথর সরিয়ে দিয়ে গতিময় জীবনের স্রোতকে প্রবাহিত করে দেওয়া ছাত্রদের অফুরান প্রাণের বৈশিষ্ট্য।

শুষ্ক ও মিথ্যা আচারের শৈবালে রুদ্ধগতি নদীর মতাে গতিহীন সমাজে আদর্শায়িত কর্মচাঞ্চল্যের প্রাণধারা প্রবাহিত করতে পারে ছাত্রসমাজ। সার্বিক ও সামাজিক কল্যাণের মন্ত্রে তারা দীক্ষিত।

পুরাতন সব কিছুকে নির্বিবাদে মেনে নেওয়া নয়, যুক্তির দ্বারা বিচার করে গ্রহণ করা হল ছাত্রদের বৈশিষ্ট্য।

কিশাের ছাত্র বিশেষ করে তাদের কৈশাের বয়সটা একটা ঝড় ও ঝঞ্জার কাল। সেই সময়ে তাদের প্রশস্ত উদার হৃদয় নতুন কিছু করতে চায়, করে দেখাতে চায়।

Read More:  প্রতিবন্ধীদের প্রতি ছাত্র ছাত্রীদের কর্তব্য বাংলা রচনা

বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সামাজিক সংস্কার ও শৃঙ্খল মােচনের ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা যথেষ্ট।

দেশসেবা ও দেশগঠন

দেশ মানে তাে কোনাে মূর্তি বা ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ পদার্থ নয়।

দেশ মানেই দেশের মানুষ ও প্রকৃতি। তাই মানুষ ও প্রকৃতির সুরক্ষা হল দেশগঠন বা দেশসেবার মূল কথা। দেশের উন্নতি মানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক উন্নতি।

দেশ যেমন অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত হবে তেমনি দেশের মানুষ, মানুষ হিসেবে বিশেষ সম্মান বা মর্যাদাকে বাড়িয়ে দেবে-এটা দেশ ও দেশের মানুষ হিসেবে সকলের কাম্য।

জগতসভায় দেশ শ্রেষ্ঠ আসন নেবে-এটা দেশের মানুষ হিসেবে কে না চায়? বলাবাহুল্য, এই শ্রেষ্ঠত্ব দেশের উন্নতিতে সম্ভব।

এই উন্নতির ক্ষেত্রে যুবশক্তির প্রতীক ছাত্রছাত্রীর ভূমিকা রয়েছে। নিজেদের বিদ্যালয় ছাড়াও দেশের একটি বৃহৎ অংশ রয়েছে, তার উন্নয়নই হল দেশের উন্নয়ন এবং তা হল দেশপ্রেম।

সমাজের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের কর্তব্য

সমাজের অস্তিত্ব নির্ভর করে পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার উপর। সমাজ থেকে শুধু গ্রহণ করব, সমাজকে কিছু দেব না-এই নিয়ম সমাজে চলতে পারে না।

সম্ভাব্য সমস্ত উপায়ে সমাজের কাছে আজন্ম-প্রাপ্ত সমস্ত ঋণ শােধ করতে হয়।

ছাত্রছাত্রীদের মনে রাখতে হবে, লেখাপড়া করে শুধু ক্যারিয়ারিস্ট হলেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যায় না, তাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।

সমাজ উন্নয়নের মতাে বিস্তৃত ও উজ্জ্বল লক্ষ্যে প্রণােদিত হয়ে আর্ত মানুষের জন্য কিছু করা অর্থাৎ সমাজসেবা করাই হল সমাজের ঋণশােধের উৎকৃষ্ট পথ।

আবার ব্যক্তির এই সামাজিক সত্তা সমাজের প্রতি একনিষ্ঠ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই বিকশিত হয়, চরিত্রে আসে সংহতির ভারসাম্য।

দেশ সেবার প্রয়োজনীয়তা

স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও ভারতবর্ষের সব মানুষ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা- স্বাস্থ্য প্রভৃতি পায়নি।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের অসম বণ্টন, পরিবেশের অবনমন, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ভারতবর্ষের সংহতিকে নষ্ট করছে।

তাই দেশের নাগরিক হিসেবে দেশগঠন বা দেশের সেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।

দেশের জন্য আমরা দেশবাসী, দেশ না থাকলে আমাদের অস্তিত্ব যে বিপন্ন-একথা উপলদ্ধি করলে দেশগঠনের উপযােগিতা ধরা পড়বে। আমরা সবাই ভাবি, ব্যক্তিগতভাবে উন্নতি মানেই তাে দেশের উন্নতি।

কিন্তু এ ধারণা জাতিগত দিক থেকে ঠিক নয়। কারণ এতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। আর এই বৈষম্যের কারণে দেশবিভাগ হয়। সেজন্য স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, আমরা জন্ম থেকে দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত।

Read More:  Top-Notch Shows On Netflix

কারণ মানুষ যখন জননীর কোলে জন্মগ্রহণ করে তখন সে বাবা-মার সন্তান। কিন্তু যেই মুহূর্তে সে মাটিতে বা ভূখণ্ডে জন্ম নিল, সেই নিরিখে সে দেশেরও সন্তান।

তাই দেশকে গঠন করার লক্ষ্যে দেশের সেবার প্রয়ােজনীয়তা আছে।

গাছের গােড়ায় জল ঢাললে যেমন গাছের কাণ্ড, পাতা, ফল, ফুল সঞ্জীবিত হয় তেমনি দেশকে ভালােবাসলে দেশের উন্নতিতে সাহায্য করলে আমরা নাগরিকরাও উন্নত হব।

কর্তব্য ও সম্মানবােধ

ছাত্রসমাজ নিজেরা যদি কর্তব্যবােধে সচেতন হয়, তারা যদি নিজেদেরকে একজন দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাহলে তাদের অনেক কিছুই করা সম্ভব। এজন্য প্রয়ােজন সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা।

সচেতনতাই পারে যে কোনাে লক্ষ্যকে সার্থক করতে।

তাই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও সরকারের উচিত ছাত্রদের মানসিকতার মধ্যে সমাজসেবার গঠনমূলক দিকটিকে তুলে ধরা ও তাদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা।

শুধু নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনমূলক দিকটিকে তুলে ধরা ও তাদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা।

শুধু নিজেদের ক্যারিয়ার গঠন নয়; শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিংবা বড়াে পদে চাকরি করা নয়, সমাজের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা সকলের আছে-এ কথা ছাত্রদেরকে বােঝানাে উচিত।

আজকের ছাত্ররা যে স্বার্থপর মনােবৃত্তির শিকার হচ্ছে, কিংবা নিঃসঙ্গতার বলি হচ্ছে তার অন্যতম কারণ ছাত্ররা এই সমাজের দায়বদ্ধতা থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলেই, জনসংযােগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেই।

শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলে হবে না; যেখানে প্রতিষ্ঠিত হব, যাদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হব, তারা যদি মনে-প্রাণে তাদের প্রতিষ্ঠা না দেয়, অন্তরে অন্তরে একটা দূরত্ব বজায় রাখে তাহলে ছাত্রদের তথাকথিত প্রতিষ্ঠা লাভের অর্থ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এজন্য প্রয়ােজন অভিভাবকদের সচেতনতা। একজন ছাত্র তার বন্ধুর বই চাইলে সে যেন না বলে যে তার মা দিতে বারণ করেছে। তাহলে তাে মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়।

দেশগঠনে ছাত্র-ছাত্রীদের করণীয়

ছাত্রছাত্রীদের দেশগঠনের ক্ষেত্রে করণীয়গুলি হল :

  • (এক) আগে দেশকে জানতে হবে। অর্থাৎ দেশের ভূগােল, ইতিহাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সমাজ, সাহিত্য প্রভৃতিকে ভালাে করে উপলব্ধি করতে হবে।
  • (দুই) দেশের সঙ্গে আমাদের মা ও সন্তানের মতাে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক না গড়ে তুললে দেশের প্রকৃত উন্নতি ঘটানাে সম্ভব নয়।
  • (তিন) দেশকে জানা ও সম্পর্ক গড়ে তােলার পর দেশের আশু চাহিদা ও সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে। প্রশ্ন উঠবে, ছাত্রছাত্রীদের অধ্যয়ন যেহেতু একমাত্র উদ্দেশ্য সেখানে এ সব কীভাবেই সম্ভব। সম্ভব হবে পড়াশােনার সূত্রে মানসিকতার মধ্যে বিষয়টিকে রাখলে। কারণ যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। মনে রাখতে হবে, ক্ষুদিরাম, সুভাষচন্দ্র তাে ছাত্রাবস্থায় দেশগঠনের কাজে লেগেছিলেন।
  • (চার) প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর নিজস্ব একটি পরিমণ্ডল আছে। সেই পরিবেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অন্ন, বাসস্থান প্রভৃতি বিষয়ে কী সমস্যা রয়েছে, তা জেনে সে ব্যাপারে দলবদ্ধভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষে তাদের পাশে দাঁড়ানাে ও ঊধ্বর্তন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানাে।
  • (পাঁচ) সমাজে বহুদিনের কুসংস্কার, ভেদাভেদ, মৌলবাদ, আঞ্চলিকতা, ভাষাগত সমস্যা প্রভৃতি থেকেই গেছে। সেইসব সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে সােচ্চার হওয়া ও ক্রমাগত প্রচার করা।
  • (ছয়) যে কোনাে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, গুজব রটানাে প্রভৃতি দেখলে প্রতিবাদী হওয়া। কোনাে স্বার্থ বা লােভের বশবর্তী না হয়ে দেশের উন্নয়নে সদর্থক ভূমিকা প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর গ্রহণ করা উচিত।
  • (সাত) কথায় আছে, অস্ত্রের থেকে কলম শক্তিশালী। তাই ছাত্রছাত্রীদের দেশের উন্নয়নে যে কোনাে সমস্যার প্রতিকারে কলম ধরা উচিত।
Read More:  একটি নদীর আত্মকাহিনী রচনা লেখ (গঙ্গা নদী)

 

অসুবিধা

আমাদের এই বিশ্বায়নের যুগে আমাদের অভিভাবকরা চান তাদের একটি বা দুটি সন্তানকে ‘ক্যারিয়ারিস্ট’ তৈরি করতে। তাদের লক্ষ্য কোনাে রকমে পড়াশােনা করে একটি চাকরি লাভ করা।

সেক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম আসবে কী করে? প্রতিযােগিতার আসরে টিকে থাকতে হলে কীভাবে এইসব অতিরিক্ত কাজ করা সম্ভব।

উত্তরে বলা যেতে পারে, ছাত্রছাত্রীরাই পারবে তাদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে এই বাধা উত্তীর্ণ হতে।

উপসংহার

শিক্ষার লক্ষ্যের অন্যতম দিক হল সমাজের সঙ্গে তার সাযুজ্য ও সংগতি স্থাপন। জীবনের সামগ্রিক দিকের উন্মােচন হল শিক্ষার লক্ষ্য।

স্বামীজি তাই বলেছেন, শিক্ষা হল মানবের অন্তর্নিহিত সত্তার জাগরণ-যা সমাজসেবার মাধ্যমে ঘটতে পারে।

তাই ছাত্রসমাজকে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা দিয়ে নয়, সত্যি কারের মানুষ করে গড়ে তুলতে গেলে সমাজসেবার প্রয়ােজনীয়তা অনস্বীকার্য।

ছাত্রছাত্রীরা তাই দেশের সেবা বা দেশগঠনে তাদের জাতীয় সত্তাকে মেলে ধরবে-একথা বলা যত সােজা, ততটা কঠিন তাকে বাস্তবায়িত করা।

এজন্য আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের পরিকাঠামাে উন্নয়ন ও দেশের আপামর মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।