তুমি সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী যে ট্রেনে আরোহন করিয়াছ

ভূমিকা: রেলগাড়ি অপেক্ষা দ্রুতগামী জানে চড়িবার সৌভাগ্য

পুথিপত্রে পড়েছি, মানুষের চড়ার জন্য এ যাবৎ যতপ্রকার যান আবিস্কার হয়েছে, তন্মধ্যে এরােপ্লেন’ই সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী।

আমি অজ পাড়াগাঁ-র ছেলে, তাতে দরিদ্র, এরােপ্লেন চড়ার সুযােগ এবং আর্থিক সামর্থ্য দুই-ই আমার নাই। এরােপ্লেনের মতাে না হােক, মােটর গাড়িও আধুনিক যুগের একটি দ্রুতগামী যান।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাতেও আমি চড়ি নাই। আমাদের গ্রামের এক বিত্তবান ব্যক্তির মােটর গাড়ি আছে বটে, কিন্তু উহাতে চড়ার অধিকার অপরের কোথায়? মােটর বাস্ও মােটর গাড়ির রকমফের।

তুমি সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী যে ট্রেনে আরোহন করিয়াছ

কিন্তু আমাদের গ্রামে আজ পর্যন্ত উহারও চল্ হয় নাই। গােযান ও পদনই সেখানে যান।

গােযানকে দ্রুতগামী যান বলতে ‘মৃচ্ছকটিকে’র চারুদত্ত-বসন্তসেনাও বােধ করি লজ্জা পেতেন। আর পদযুগলকে কোনাে অভিধানকার আজ পর্যন্ত “যান’ আখ্যা দেন নাই।

কিন্তু নিকট-আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য আমাকে কয়েকবার রেলগাড়িতে চড়তে হয়েছে।

রেলগাড়ি অপেক্ষা অন্য কোনাে দ্রুতগামী যানে চড়িবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। নিম্নে সেই যানেরই একটি সাধারণ সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছি।

সামান্য ঘটনা হইতে বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সৃষ্টি

অতি সামান্য ঘটনা হতেই অনেক সময় অত্যাশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঘটে থাকে।

ঐ সকল সাধারণ ঘটনা সাধারণ লােকেরা প্রত্যহই প্রত্যক্ষ করে থাকেন, কিন্তু বিশেষ বৈজ্ঞানিকের মস্তিষ্কে বিশেষ ক্ষণে উহাই বিশেষ আন্দোলন উপস্থিত করে।

এবং উহারই সূত্র ধরে গবেষণার ফলে অভূতপূর্ব ও অদৃষ্টপূর্ব আবিষ্কার সম্ভবপর হয়।

নিউটন ও বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন

আপেল তাে গাছ থেকে অনেক সময় পড়ে, কিন্তু কে উহাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করে? অথচ, বিশেষ একটি মুহূর্তে নিউটনের নিকট উহা নৃতন অর্থ বহন করে আনল।

তার মনে প্রশ্ন জাগল, আপেল আকাশের দিকে না উঠে মাটিতে পড়ে কেন? এবং তার সূত্র ধরে তিনি আবিষ্কার করলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। প্রবল ঝড়ের মধ্যে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন প্রথম অনুভব করিয়াছিলেন বিদ্যুৎ-শক্তির।

মরা ব্যাঙ নিয়ে পরীক্ষা করিতে গিয়াই তে গ্যাভানি আবিষ্কার করিয়াছিলেন বিদুৎ-রহস্যের।

জেমস্ ওয়াট, ও জর্জ স্টিফেনশন

ঠিক একইভাবে ফুটন্ত চায়ের কেটলির উঠা-পড়া দেখেয়েই জেমস্ ওঅট আবিষ্কার করিয়াছিলেন বাষ্প শক্তির ।

সেটি ১৭৬৯ খ্রীস্টাব্দের কথা। বস্তুতঃ, রেলবান সৃষ্টির উহাই বীজ। এই বীজকে অঙ্কুরিত করেছিলেন জেমস্ ওঅট-ই।

তিনিই বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কর্তা প্রথমে ঐ ইঞ্জিন কয়লার খনিতে ব্যবহৃত হত। কিন্তু রেলযানের ইঞ্জিন আবিষ্কৃত হয়েছিল আরও প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পরে। জর্জ স্টিফেনশন সেটির আবিষ্কারক।

এই আবিষ্কার সম্ভবপর হয় ১৮১৪ খ্রীস্টাব্দে। ১৮২১ খ্রীস্টাব্দে তিনি যে-লােকোমােটিভ ইঞ্জিনের দ্বারা গাড়ি চালান, তাহা ঘণ্টায় বারো মাইল বেগে আটত্রিশখানি গাড়ি নিয়ে চলতে সক্ষম হয়েছিল।

রেলযান সৃষ্টির বাস্তব পরিবেশের উদ্ভব

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাষ্পীয় শক্তি ও বাষ্পীয় ইঞ্জিন লােকোমােটিভ ইঞ্জিনের পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে আবিষ্কৃত হলে ও তথনই কেন উহাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয় না?

ইহার উত্তর জানতে হলে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার শরণ নিতে হয়। ইতিহাস বলে, জগতে সব কিছুই নির্ভর করে পরিবেশের উপর। রেল-ইঞ্জিন ১৭৬৯ খ্রীস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে আবিষ্কৃত হলেও উহার ব্যাপক প্রচলনের মতাে পরিবেশ তখন সেখানে ছিল না।

অর্থাৎ তখনও বিত্তবান্ বুর্জোআ বণিকদের প্রতিষ্ঠালাভ ঘটেনি।

১৭৮৯ খ্রীস্টাব্দে ফরাসী বিপ্লবের পর হতেই বিত্তবান বণিক শ্রেণীর উত্থান এবং ইওরােপে, বিশেষতঃ ইংল্যাণ্ডে, শিল্প-প্রসারের প্রয়াস। এই প্রয়াসের মুখেই প্রয়ােজন হয়েছিল এমন একটা কিছুর যাহা শিল্প-প্রসারকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

রেলযান ও ভারতবর্ষ

উহার, অর্থাৎ রেলযান-সৃষ্টির, পর হইতে রেলযানের প্রচুর উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে তড়িৎ-শক্তিতেও রেলগাড়ি পরিচালিত হয়েছে।

পৃথিবীর সকল দেশেই মাকড়শার জালের মতাে রেল-লাইন ছড়াইয়া পড়েছে ভারতবর্ষে রেলযানের প্রচলন হয় ডালহাউসীর আমলে ১৮৫৩ খ্রীস্টাব্দে।

বর্তমানে ভারতবর্ষে ছয়টি রেলপথ আছে- নর্দার্ন রেলওএ, সাদা রেলওএ, ওএস্টার্ন রেলওএ, সেন্টাল রেলও, ঈস্টার্ন রেলওএ এবং নর্থ-ঈস্টান রেলওএ। ভারতের মােট রেলপথ চৌত্রিশ লক্ষ মাইলের মতো।

এক্ষণে পশ্চিমবঙ্গের ‘চিত্তরঞ্জনে’ ইঞ্জিন নির্মাণের কারখানাও তৈরী হয়েছে।

রেলগাড়ির সাধারণ পরিচয়

রেলগাড়ি চলার সময় প্রথমে থাকে ইঞ্জিনে। এনি-পরিচালক এই ইঞ্জিনে থেকেই গাড়ি পরিচালনা করেন। ইঞ্জিনের পশ্চাতে আরও অনেক গুলি গাড়ি পর-পর সংলগ্ন থাকে।

উহাদের কিছু মালবাহী গাড়ি, রেলগাড়ির সাধারণ পরিচয় কিছু যাত্রিবাহী গাড়ি। শুধু মালবাহী গাড়িও আছে। সাধারণত, প্রায় সর্বশেষে থাকে ‘গার্ডের’ গাড়ি।

গাড়ির দায়িত্ব থাকে এই গার্ডের উপরেই। তিনিই নিশান বা আলাের সংকেতে গাড়ি চালাবার ও থামাবার আদেশ দেন।

রেলগাড়ি চলে সমান্তরালভাবে স্থাপিত লােহার রেললাইনের উপর । জানালাহীন মালগাড়িগুলি সাধারণত চারিদিকে ঢাকা থাকে। খােলা মালগাড়িও আছে।

যাত্রিবাহী গাড়ির তিনটি শ্রেণী আছে-প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়। পূর্বে‘মধ্যম শ্রেণী’ নামক আর-একটি শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া বেশি। জনসাধারণ তৃতীয় শ্রেণীতেই যাতায়াত করে থাকেন।

রেল স্টেশন

ট্রেন-চলাচলের সুবিধার জন্য রেলপথের মাঝে মাঝে ‘স্টেশন’ আছে। গাড়ি চলিবার সময় শুধু স্টেশন গুলিতেই থামে। বড় স্টেশনগুলিতে গাড়ির ইঞ্জিন জল ও কয়লা নিয়ে থাকে।

রেলযাত্রিগণ স্টেশনের টিকিট-ঘর হতেই টিকিট কিনে আইনতঃ ট্রেন ভ্রমণ করতে পারেন। স্টেশনেই যাত্রিগণ উঠা-নামা করেন ; মালপত্র উঠানাে নামানো হয়। মালপত্রাদি চালান দিতে হলে নির্দিষ্ট মাসুল দিতে হয়।

রেলযানের উপকারিতা

প্রত্যেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই মানুষের কল্যাণ করে থাকে। রেলযানের ব্যাপারেও ইহার অন্যথা হয় নাই। পূর্বে দূরদেশে যেতে হলে হয় হাঁটিয়া, না হয় নৌকায় যেতে হত।

তাও অতি দূরদেশে যাওয়া সকলের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। কারণ পথ ছিল অতি বিপদসংকুল।

কেহ দূরযাত্রা করিলে বাড়িতে কান্নার রােল উঠিত ; কারণ, যাত্রীটি-যে কোনােদিন ফিরে আসবেন, এমন বিশ্বাস কেহ করিতে পারতেন না। রেলযান প্রচলিত হবার ফলে দূরষা।

কেবল সুগমই হয়নি, উহা অতি ত্বরান্বিত এবং অল্প-ব্যয়সাধ্য হয়ে উঠেছে।

এখন মানুষ দেশ ছাড়িয়া হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশে গমন করিতেও ভয় বা দ্বিধা বােধ করেন না। রেলে চড়িয়া প্রসিদ্ধ দর্শনীয় স্থান ও বস্তুগুলি সকলেই দেখে আসতে পারেন।

ইহাতে আনন্দের সঙ্গে প্রত্যক্ষ জ্ঞানলাভও হয়ে থাকে। ব্যবসায়ীদের পক্ষে রেলযান তো সম্পূর্ণ অপরিহার্য। নানা ব্যাপারেই ইহা দেশ ও বিদেশের মধ্যে প্রধান যােগসূত্র।

এদেশে রেলযানের উপকৃত কারণ

রেলগাড়ির অপকারিতা সম্পর্কে অনেকে ‘খানাভােবার জন্য ম্যালেরিয়ার উৎপত্তি, ‘জমি ও কৃষিকার্যের অবনতি, অত্যধিক শস্য চালানে সাধারণের অন্নকষ্ট প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ করেন।

কিন্তু এইগুলিকে রেলযানের অপরিহার্য কুফল বলে মানে নেওয়া যায় না। কারণ, অন্যান্য বহু দেশে রেলযানের এই সকল কুফল পরিলক্ষিত হয় না।

ভারতবর্ষে এইরূপ হবার কারণ কী, তাহা জানতে হলে এদেশে রেলযান স্থাপনের বাস্তব ইতিহাস আলােচনা করতে পারলে ভালো হত।

উপসংহার

বর্তমানে এখন প্রায়শই এখানে রেল-দুর্ঘটনা হয়, এবং বহু নিরীহ যাত্রী সংকটে থাকেন। এক্ষেত্রে জাতীয় সরকারকেই আন্তরিকভাবে অগ্রসর হয়ে আসিতে হবে।

রেল-দুর্ঘটনার হেতুগুলিকে নির্মম ভাবে সমূলে উচ্ছেদ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই ইহা করা উচিত।

বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে যদি আমরা জীবনে কল্যাণকর করে তুলতে না পারলাম তবে সেই লজ্জা রাখবার স্থান হবে না।