খেলার মাঠের আকর্ষণ সম্পর্কে একটি রচনা

ভূমিকা

চলমান জীবনে প্রতিনিয়ত কত কিছুই না আমাদেরকে আকৃষ্ট করে। গঙ্গার কলকল্লোল, টাইগার হিলের সূর্যোদয়, পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝরনা, কিংবা উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আমাদেরকে সহজেই কাছে টানে। একইভাবে আমরা খেলার মাঠের দিকেও আকৃষ্ট হই।

খেলার মাঠের আকর্ষণ

গুরুত্ব

স্বামী বিবেকানন্দের স্মরণীয় উক্তি, “গীতাপাঠ অপেক্ষা খেলাধুলা ভালাে”-একথা যেমন সত্য তেমনি আমার কাছে সত্য খেলার মাঠ হল জীবন রঙ্গমঞ্চের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র। লেনিন বিশ্বাস করতেন, যে কোনাে কাজ, তা তিনি শিক্ষক হােন, শিল্পী হােন, কৃষক বা বিজ্ঞানী হােন, শ্রমিক হােন-প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজ নিখুঁত ভাবে এবং বেশি করে করতে হলে চাই সুস্বাস্থ্য।

কারণ স্বাস্থ্যই সম্পদ। সেই স্বাস্থ্যকে সঠিক রাখতে হলে খেলার মাঠ তার উপযুক্ত ক্ষেত্র। চীনের স্কুল-কলেজে, কল- কারখানায়, এমনকি সেনাবাহিনীতে খেলাধুলা অপরিহার্য। তাই শক্ত সমর্থকর্মঠমানুষ গঠনের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের কোনাে বিকল্প নেই।

কেন আকর্ষিত হই?

আমরা কেন খেলার মাঠে যাওয়ার জন্য উদ্বেল হয়ে উঠি ? এরকম বহু প্রশ্নের উত্তর আমরা দিতে পারি না। অথচ হাজারাে প্রতিবন্ধকতা মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে নিয়ে আমরা খেলার মাঠে হাজির হই, সময় নষ্ট করি, অর্থ ব্যয় করি। এর প্রধান কারণ আমরা খেলাকে ভালােবাসি, আমাদের মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা শিশু মনটি আমাদের ঠেলে, দাবড়ে, ছুটিয়ে খেলার মাঠে নিয়ে যায়।

প্রিয় খেলােয়াড়ের প্রতি, কিংবা প্রিয় দলের প্রতি এ যেন এক অমােঘ ভালােবাসা। যুক্তিশীল মন নিয়ে, বাস্তব-অবাস্তবের গ্রাহ্যতায় এই আকর্ষণের কারণকে বিচার করা যায় না।

আকর্ষণের কিছু অন্যতম কারণ

এই আকর্ষণের কারণগুলি হল : 

(১) জীবনে যেমন সার্থকতা ও ব্যর্থতা আছে, সেই দিকটি খেলার মাঠে জয়-পরাজয়ের মধ্যেই সূচিত হয়। আমাদের মানসিক গঠন বাইরের বিষয়ের সঙ্গে সাযুজ্য খোঁজে। আমাদের মনের মধ্যেকার প্রাপ্তি ও ব্যর্থতার বােধ খেলার মাঠের মধ্যে খুঁজে নেবার চেষ্টা করে।

Read More:  ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিক দূষণ নিয়ে বাংলা রচনা

(২) মানুষের জীবনে কাজও চাই আবার কাজের পরে বা মাঝখানে অবসরও মানুষ পেতে চায়। সেই অবসরের সুযােগে খেলার মাঠ মানুষকে বেশি টানে। নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনের রােজনামচায় মানুষ যখন হাঁফিয়ে ওঠে, ক্লান্ত হয় তখন খেলার মাঠের হাতছানি তাকে বন্দত। থেকে মুক্ততার আনন্দে আনন্দিত করে।

(৩) মানুষের মনের মধ্যে নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনে যে ক্লেদ জমে, মানুষ যে স্বার্থ দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়, সেইসব ক্লেদ থেকে মুক্তি পেতে গেলে খেলার মাঠের যে বিকল্প নেই, তা চিন, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশ উপলব্ধি করতে পেরেছে।

(৪) শুধু শারীরিক, মানসিক বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে খেলার মাঠের আকর্ষণ নয়, চারিত্রিক গুণাবলীর বিকাশের জন্যও সমান আকর্ষণীয় হল খেলার মাঠ। খেলার মাঠে পারস্পরিক সহযােগিতা, সহাবস্থান, ত্যাগ, উদারতা, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা, নেতৃত্ব প্রভৃতি গুণাবলীর বিকাশ ঘটে।

(৫) খেলার মাঠ বিশ্বমৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের ক্ষুদ্র সংস্করণ। যখন দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে বর্ণে বর্ণে বিদ্বেষ সেখানে খেলার মাঠই পারে ভেদাভেদ মুছে ফেলে বিশ্বমৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে নিজেদের বাঁধতে।

(৬) খেলার মাঠ আমাদের দেশপ্রীতিকে তথা জাতীয়তাবােধকে উদ্দীপিত করে। ১৯৮৩-তে কিম্বা ২০১১-তে ক্রিকেটে ভারতের বিশ্বজয় দেশবাসীকে যে জাতীয়তাবােধে উদ্দীপিত করেছিল, তা বলাবাহুল্য।

(৭) শিশু কিশােরদের কাছে খেলার মাঠের আকর্ষণ বেশি, কারণ খেলার মধ্যে যে আনন্দ, তা আর কোথাও তারা পায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বর্তমানে কম্পিউটারে কিম্বা মােবাইলে গেম খেলার মাধ্যমে তারা দুধের স্বাদ ঘােলে মেটাচ্ছে।

খেলা ও খেলােয়াড়ি মনােবৃত্তি

খেলার মাঠের আকর্ষণের প্রধান কারণ অবশ্যই খেলা। সাধারণত আমরা প্রিয় কোনাে দল, কিংবা প্রিয় প্লেয়ার বা প্লেয়ারদের সমর্থনের টানে খেলার মাঠে হাজির হই। তাদের সাফল্য আমাদের সাহস জোগায়, ব্যর্থতা আমাদের বিষন্ন করে। খেলার শৃঙ্খলতাও আমাদের মাঠমুখী করার কারণ হতে পারে।

খেলা পরিচালকের পরিচালনার দৃঢ়তা আমাদের শৃঙ্খলাবােধের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে। হয়তাে সেই শৃঙ্খলতা-পরায়ণতার উদাহরণ দেখতেই মাঠে হাজির হই। সুতরাং শততমুখী টানেই আমরা মাঠে নিজেদেরকে নিয়ে যাই।

Read More:  ছাত্র জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে বাংলা রচনা

আধুনিক যুগ ও খেলার মাঠ

আধুনিক যুগ যান্ত্রিকতার যুগ, কৃত্রিমতার যুগ। প্রাচীনকালে মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে হত। কিন্তু এখন জীবনের সর্বক্ষেত্রে যন্ত্রের আধিপত্য।

যন্ত্রই কাজ করে, মানুষ বসে বা দাঁড়িয়ে তা পরিচালনা করে। ফলে কায়িক পরিশ্রম হয় নিতান্ত অল্প। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক পরিশ্রম বেশি হয়।

মানসিক পরিশ্রমের সঙ্গে সমতা রেখে শরীর চালনা না হলে বিভিন্ন ধরনের অসুখের কবলে পড়তে হয়। অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য প্রভৃতি লক্ষণ শারীরিক পরিশ্রমের অভাবেই হয়। তাই খেলার মাঠের আকর্ষণ যথেষ্ট।

মাঠের পরিবেশ

আমার মতে খেলার মাঠের অন্যতম আকর্ষণ মাঠের পরিবেশ। মাঠের পরিবেশ প্রধানত দুরকম মাঠের ভিতরকার পরিবেশ যার মধ্যে থাকে খেলােয়াড়, পরিচালক ও সাহায্যকারী। আর অন্যটি হল বাইরের পরিবেশ, যার মধ্যে দর্শকই প্রধান। তবে নিরপত্তা রক্ষীরাও মাঠের পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

খেলােয়াড়দের দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতা

খেলার মাঠের এক আকর্ষণ খেলােয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার দিক। খেলােয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শক্তি দেখে আমরা নিজেদের উদ্দীপিত করে নিতে পারি। তাদের মানসিকতা আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে দেয়।

খেলার মাঠের বৈচিত্র্য

খেলার মাঠের বৈচিত্র্য আকর্ষণের আর এক অন্যতম কারণ। এখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ এসে সমবেত হয়। জীবিকার সন্ধানে আসা হকারেরাও খেলার মাঠে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। তাদের বিচিত্র কণ্ঠের হরেক ধরনের চিৎকার আমাদের যেন হরবােলা শেখায়। চেনা-অচেনা বহু লােকের চিৎকার, হাসি, ঠাট্টা, তামাশা আমাদের নির্মল আনন্দ দেয়। চিত্তের প্রশান্তি নিয়ে আসে। আমরা লাভ করি এক স্বর্গীয় অনুভূতি। আর এই অনুভূতি প্রাপ্তির ঐকান্তিক আকর্ষণেই আমরা হয়তাে বৈচিত্র্যবহুল খেলার মাঠে ছুটে যাই।

অনান্য আকর্ষণ ও খেলার মাঠ

প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন গৃহস্থের সাংসারিক জীবনের প্রতি যে আকর্ষণ, একজন কৃপণের পয়সা জমানাের প্রতি যে আকর্ষণ, একজন প্রেমিকের প্রেমিকার প্রতি যে আকর্ষণ এবং একজন খেলা-প্রেমিকের খেলার মাঠের প্রতি আকর্ষণ কী এক?

Read More:  সাহিত্য পাঠের গুরুত্ব রচনা

উত্তরে বলা যেতে পারে, সব মানুষের লক্ষ্য যেমন সমান নয়, তেমনি আকর্ষণীয় বিষয়ও এক হতে পারে না। তবে খেলার মাঠের প্রতি আকর্ষণ যে কোনাে স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের একটা অন্তরের তাগিদ-কম-বেশি হতেই পারে।

উপসংহার

খেলার মাঠ আমাদের কাছে উপমহাদেশের মতাে। এখানে নানা দেশের, নানা ভাষার নানা রুচির লােক হাজির হয়। এ যেন ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান রচনা করে। তা ছাড়া আমাদের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য নীরােগ শরীরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা। তাই খেলার মাঠে সুঠাম দেহের অধিকারী কোনাে বয়স্ক ব্যক্তিকে দেখলে আমরা স্বাস্থ্য সচেতন হই। কর্মব্যস্ত দ্রুতগতির এই জীবনে খেলার মাঠ আমাদের অনাবিল আনন্দ দেয়, মুগ্ধতা দেয়, নির্মল প্রসন্নতা নিয়ে আসে। তাই খেলার মাঠের এত আকর্ষণ।