কলা গাছ বিষয়ে প্রবন্ধ-রচনা

সূচনা

কলাগাছ আমাদের খুবই উপকারী গাছ। কঁচা ও পাকা দুই শ্রেণীর কলাই বিশেষ উপাদেয় খাদ্য। সুপুষ্ট পাকা কলা খেয়ে তৃপ্তিলাভ করে না এমন মানুষ বােধ হয় আমাদের দেশে নেই।

বর্ণনা

কলা তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ। ইহা গােল এবং খুব বেশি মােটা নয়। ইহার শরীর বেশ নরম ও রসাল। ইহার কোন ডাল পালা হয় না। সােজা ৮ থেকে ১০ হাত উপরে উঠে যায়। ইহার দেহ বড় বড় খােলায় তৈয়ারী। কলাগাছের পাতা বেশ চওড়া ও লম্বা হয়। কলাপাতার রঙ দেখিতে ভারী সুন্দর। পাতার মধ্য দিয়া একটি মােটা ডাটা চলে গেছে, ইহাকে শির দাড়া বলিতে পারি। কলাগাছের শিকড় বেশ ছােট ছােট ইহা মাটিকে বেশী দূর ভেদ করতে পারে না।

উপাদান প্রণালী

কলাগাছের চাষ এমন কিছু ব্যয় বহুল নয়। ছােট ছােট ২৷৩ হাত লম্বা চারা গাছগুলিকে মাটি থেকে শিকড় শুদ্ধ তুলে অন্যত্র গর্ত করে লাগাতে হয়। ঐ গর্তে পাক দিলে ভাল হয় । কারণ পাঁক কলাগাছের পক্ষে খুব প্রয়ােজনীয় সার।

৩৪ মাস পরেই ঐ গাছের ধারে ধারে অনেক চারা বের হয়। কলাগাছের বংশবৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়। “গাছ লাগাবার ৭৮ মাস পরেই কলা- গাছের ফুল আসে। ঐ ফুল লাল রঙের খােলায় ঢাকা থাকে উহার নাম মােচা। ক্রমে মােচার খােলা ঝরিয়া পড়ে, তখন কাদিতে ছােট ছােট কলা দেখা দেয়। প্রত্যেক ‘ছড়া’য় আট দশটি করে কলা থাকে।

একটি কাঁদিতে পনের ষােলটির বেশি ছড়া থাকে । কলা যখন সুপুষ্ট হয় তখন সবুজ রঙ ধারণ করে। পাকা কলা দেখিতে হলদে। পাকা কলার গন্ধ ভারী চমৎকার। কলা পাকলে গাছ থেকে কাদি কেটে এনে ঘরে রাখতে হয়, তা নাহলে কাক ইত্যাদি পাখী ইহাকে নষ্ট করে ফেলে।

কলার বীজ থেকে গাছ হয় না, কাণ্ড এখন থেকেই চারা বাহির হয়। একটি গাছে একবারের বেশি ফল ধরে না। তাই কাদি কেটে নেওয়ার পর গাছটিকে নষ্ট করে ফেলতে হয়। কলার ঝাড় সব সময় পরিষ্কার রাখতে হয়, না হলে পোকায় গাছ নষ্ট করে দেয়। জলের ধারে রসাল মাটিতে কলাগাছ ভাল হয়। আমাদের দেশে জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় শ্রাবণ মাসে কলা গাছ লাগাতে হয়।

প্রাপ্তিস্থান

ভারতবর্ষে বাংলাদেশে এবং মাদ্রাজেই প্রচুর কলা উৎপন্ন হয়। এছাড়া এশিয়ার নানা জায়গায় এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কলা পাওয়া যায়। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জেও প্রচুর কলা হয়। জলা জায়গা ও রসাল মাটিতেই কলা ভাল হয়।

শ্রেণীভেদ

আকার ও স্বাদের দিক দিয়ে বিচার ককরলে কলার নানা- প্রকার শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছ। আমাদের দেশে কাটালি, মর্তমান ও চাপা এই তিন প্রধান শ্রেণীর কলা দেখতে পাওয়া যায়।

মতমান ও চাপা কলা খেতে খুবই ভাল লাগে। বাচ্চাদের পক্ষে কাটালি কলা উপকারী। তাহা ছাড়া সিঙ্গাপুরী, কাবুলি ইত্যাদি নানা প্রকারের কলা আমাদের দেশে পাওয়া যায়।

কলার ভিতর বিচি খুবই কম থাকে। কিন্তু একপ্রকারের কলা আমাদের দেশে পাওয়া যায় যার বিচি একটু বড়। বিচি কলাতে প্রচুর বিচি থাকে, এই কলার আকার ও বেশ বড় এবং ফলনও প্রচুর। কাচা ও পাকা উভয় প্রকার কলারই কদর আমাদের দেশে আছে।

কাঁচা বিচি কলার তরকারী হয় আর পাকা বিচি কলা পূজা প্রভৃতিতে লাগে। আমাদের দেশে যে সমস্ত মেয়েরা শিবচতুর্দশীর ব্রত করেন তাহারা ঐদিন বিচিকলা খেয়ে থাকেন। ঐ কলা নাকি বেশ ঠাণ্ডা, তাই পেটের পক্ষে ও উপকারী। চাপা কলা দুই রকম স্বাদের হয়, টক ও মিষ্টি।

ইহা খুবই উপাদেয় খাদ্য। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে যে কলা হয় উহার খােসা খুবই পুরু; ইহা আমাদের দেশের কলার মত এত সুন্দরও নহে। পাকলে ঐ কলার রঙ সবুজ থাকে। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ হইতে হাজার হাজার কাদি কলা ইউরােপে রপ্তানি হয়। সম্প্রতি আমাদের দেশ থেকেও বিদেশে কলা রপ্তানী করা হয়েছে।

উপকারিতা

কলা অতি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। ইহাতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম আছে। কলাগাছের মােচা, থােড় ইত্যাদি আমাদের দেশে তরকারী হিসাবে ব্যবহৃত হয় । কাঁচ কলার তরকারী রােগীদের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।

বড় বড় উৎসব অনুষ্ঠানে আমাদের দেশে কলার পাতায় লােককে খেতে দেওয়া হয়। কোন কোন দেশে পাকা কলা শুকিয়ে তাহা কুটিয়া ময়দা করিয়া রুটি তৈরী কর খায়। কলাগাছে শুনাে খােলা পুড়াইয়া একরকম ‘ক্ষার’ তৈরী করা হয়, এই ক্ষার দ্বারা কাপড় পরিষ্কার হয়। কলাগাছের পাতা গরুর উপাদেয় খাদ্য কলাগাছের ছালকে আমাদের দেশে সরু সরু করিয়া ছিড়ে বেড়ায় গাঁট দেওয়া হয়।

পল্লীগ্রামে বর্ষাকালে কলাগাছ কাটিয়া ভেলা প্রস্তুত করা হয়। কলাগাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে। এক বৎসরের মধ্যেই কলাগাছে ফল ধরে। কলা ঝাড়ের ভালােরকম যত্ন নিলে প্রচুর কলা হয়, বাজারে কলার দামও এখন বেশ বেশী-তাই আয়কর ফল হিসাবেও কলাচাষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খনার বচনে আছে-

‘তিনশ’ ষাট কলা রুয়ে
থাগে চাষী ঘরে শুয়ে।’

উপসংহার

যদিও আমাদের দেশে লােককে ঠকানাে অর্থে ‘কলা দেখানাে কথাটি ব্যবহৃত হয় তথাপি এই কথা বেশ জোরের সঙ্গে বলা যেতে পারে যে কলা কিন্তু কাউকে ঠকায় না। কলা মানুষের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী ফল। কলা প্রায়ই আমাদের কোন ক্ষতি করে না।