একটি নির্জন দুপুরের স্মৃতি নিয়ে প্রবন্ধ লেখ

ভূমিকা

স্মৃতি সবসময় সুখের হয় না। বেশির ভাগ স্মৃতিই দুঃখের, স্মৃতি বেদনাময়। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালােবাসে? তবুও আমার জীবনে গ্রীষ্মকালের এক নির্জন দুপুরের স্মৃতি আমি কখনই ভুলব না।

পটভূমি

তিমিরভেদী সূর্যের আলােয় রাত্রিকালীন জড়তা কাটিয়ে বসুন্ধরা ছন্দ পায়। শুরু হয় মানুষের ব্যস্ততা। তারই মাঝে কেউ কেউ একান্তে আপন করে পেয়ে যায় খণ্ড সময়ের চকিত উপহার।

আমিও পেলাম-এরকম একটা নির্জন দুপুর।

সময়টা ছিল মার্চ মাসের শেষ। এপ্রিল মাসের প্রথমে বাৎসরিক পরীক্ষা শুরু হবে। তাই পড়ার চিন্তাটা ছিল। এমনকি নিত্য-নৈমিত্তিক একঘেয়ে জীবনে শুধু পড়াশােনা আর ভালাে লাগছিল না।

আমার প্রতিদিনের কাজ হল দুপুরবেলা সবাই ঘুমিয়ে গেলে পড়তে বসা। ঐ সময় আমার পড়া বেশ ভালাে হত। সেদিন আমার বাড়িতে অনেক লােকজন এসেছে।

গরমও ছিল খুব তাই সিদ্ধান্ত করলাম পুকুরপাড়ে মাদুর পেতে বসে পরীক্ষার পড়া পড়ব।

বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য অপূর্ব। প্রতিটি ঋতুতে প্রকৃতির রূপ বদল হয়। শীতের দুপুর যত রমণীয়, গ্রীষ্মের দুপুর তত মনােরম নয়।

আবার বসন্তের দুপুর যত আনন্দময়, বর্ষার দুপুর তত আনন্দ দিতে পারে না। অবশ্য প্রয়ােজনসাপেক্ষে যে কোনাে দুপুরই আবার রমণীয় হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে যা কর্কশ ও মধুর সেই কেকারবও নির্জন বর্ষার দিনে কর্মহীন সময়ে মধুর হয়ে ওঠে। তাই অকথাসাপেক্ষে যে কোনাে দুপুরই আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে। আমার জীবনেও দুপুরের রূপ অরূপ হয়ে উঠেছিল।

কীভাবে দিনটি পেলাম

সেদিন আমাদের বাড়ির কাছাকাছি এক দিঘির ধারে দুপুরবেলায় চুপচাপ বসেছিলাম। হঠাৎ সেই নির্জন দুপুরে আমার কাছে খুলে গেল এক নতুন দিগন্ত।

নির্জনতা যে এত সুন্দর হয় এত মােহময় হয়, তা আমার আগে জানা ছিল না। নির্জন দুপুরের সেই মােহিনী স্মৃতি আমাকে আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

নির্জন দুপুরের চিত্র

যারা গ্রীষ্মকালের গ্রামের দুপুর সম্বন্ধে অবহিত, তারা বুঝতে নিশ্চয় পারবেন, ভ্যাপসা গরমে গাছের তলায় পুকুরপাড়ে অনেকটা আরাম পাওয়া যায়। এ এক বিদ্যুৎ জ্বালা বৈশাখের দুপুর।

বয়ে যাচ্ছে আগ্নেয়প্রবাহের তরল স্রোত। সেই স্রোতে পুড়ে যাচ্ছে গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন। ফুটিফাটা মাঠের  বুক থেকে বেরিয়ে আসছে তপ্ত শ্বাস। তারা সূর্যকে প্রসন্ন করার জন্য স্তব করছে।

আমাদের পুকুরের পাড় ঘনঘন তাল গাছ দিয়ে ঘেরা। একদিকে বাঁশ বাগান। পুকুরের একপাড়ে শান বাঁধানাে ঘাট। ঘাটের দুদিকে বকুল গাছ ও আম গাছ।

আমি সেই আম গাছের তলায় মাদুর পেতে বসে পড়াশােনার জন্য উদ্যোগ করলাম। পুকুরের ওপারে যতদূর মাঠ দেখা যায়, রােদ যেন খাঁ খাঁ করছে।

তাল গাছগুলি এক পায়ে দাঁড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। পড়ায় একদম মনােযােগ নেই।

একে গরম, তারপর প্রকৃতির এমন রূপ একাকী নির্জনে বসে উপলব্ধি করার সুযােগ হাতছাড়া করতে ইচ্ছা হল না। কিন্তু পরীক্ষার ভয়ও ছিল।

রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। আমাদের বাড়ির থেকে দূরে একটা মাঠ। সেখানে আছে কয়েকটি গাছ। সেই গাছগুলি নতমুখ লাগছে। মনে হচ্ছে- ওই শূন্য নীরব মাঠে তারা রৌদ্রের প্রজা।

এই সময় পুকুরের পাড়ে একটা বটগাছ থেকে একটা লাল বটফল টুপ শব্দে জলে পড়ে।

সেই শব্দে এক ঝাঁক লাল রুইমাছ ভেসে উঠল এবং খেলােয়াড়দের বল দখলের মতাে রুইমাছগুলাে ওই ফলটি মুখে নেবার জন্য চেষ্টা করতে লাগল বটফল ও মাছের রং মিলেমিশে একাকার।

পুকুরের স্বচ্ছ জলে মাছের এই আনাগােনা আমার জীবন বিজ্ঞানের একটা পাঠ সমাপ্ত করে দিল। আমি তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভাসমান রুইমাছের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখে নিলাম।

ওদিকে মাঠ পেরিয়ে এক ক্লান্ত পথিক পুকুরের এক প্রান্তে এসে জলপান করে ঠাণ্ডা করল শরীরকে।

তখন বুঝলাম জলই জীবন। এদিকে চাতক পাখির বিরাম নেই। চোখ গেল চোখ গেল’ স্বরে ডেকেই চলছিল, কোকিলও তা শুনে মিষ্টিস্বরে তাল ধরেছিল।সূর্যের প্রতিচ্ছায়া দিঘির জলে।

সূর্যতাপে দিঘির হৃদয় উষ্ণ হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়, ভালােবাসার উষ্মতায় সে-এক কবিকণ্ঠে সূর্যকে কিছু বলে।

দিঘিতে গা ডুবিয়ে বসে আছে কয়েকটা কুকুর। ক্লান্ত পাখি দিঘির জলপান করে নিজের শরীরকে ঠান্ডা করে। পাতিহাঁসগুলাে জলের মধ্যে ডুব দিয়ে গুগলি খায়। বুঝতে পারলাম, জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দিয়েই জ্ঞান সঞ্জয় করতে হয়।

একটু দূরে মাটির পথ দিয়ে এক দইওয়ালা ‘দই চাই, দই চাই’ বলতে বলতে এগিয়ে চলেছে। মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের অমল ও দইওয়ালার প্রসঙ্গ।

তারপর দীর্ঘক্ষণ কোনাে শব্দ নেই। সব শব্দ এই নির্জন দুপুরের ক্রুদ্ধ ইঙ্গিতে যেন থেমে গেছে।

নির্জন দুপুরের প্রতিক্রিয়া ও অনুভূতি

প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আমার মনের নির্জনতাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমগাছ থেকে একটি করে পাতা খসে পড়ছে, আর আমার মনের পটে ভেসে উঠছিল কত স্মৃতি।

ছেলেবেলাকার কত স্মৃতির পৃষ্ঠা যেন এক এক করে খুলে যাচ্ছিল।

যেমন-দিদির সঙ্গে স্কুল থেকে এসে ঝড়ের পর আম কুড়ােতে যাওয়া, ২৫শে বৈশাখে রবীন্দ্র জন্মােৎসব পালন করার জন্য এই বকুল গাছের তলায় ছড়িয়ে থাকা বকুলফুল কুড়িয়ে মালা তৈরি করা, কোনাে উৎসব অনুষ্ঠান উপলক্ষে বড় জাল ফেলে এই পুকুর থেকে মাছ ধরা।

একসময়ে গ্রামে নলকূপ না থাকায় এই পুকুরের জল কত লােক পান করত প্রভৃতি নানান ঘটনার কথা অবলীলাক্রমে মনে চলে এল।

এদিকে তাকিয়ে দেখি, আমাদের পােষা কুকুরটা- সেও গরম সহ্য করতে না পেরে জিভ বের করে হাঁফাতে হাঁফাতে নিদ্রা যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে চোখ মেলে তাকাচ্ছে-আমি কতটা পড়ছি যেন দেখছে।

ইতিমধ্যে আমাদের বাড়ির অতিথিদেরও বাড়ি ফেরার সময় হওয়ায় তাদের নিয়ে মা বাইরে বেরােতেই আমি আবার পড়ায় মন দিলাম ও গুণগুণ করে পড়তে থাকলাম।

কিন্তু এক ঘণ্টার নির্জন দুপুরের স্মৃতি যেন আমাকে ভাবিয়ে তুলল। তাই পড়তে পড়তে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলাম।

আমার মনে পড়ছে কবি অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘মধ্যাহ্নে’ কবিতার কথা। আমগাছ থেকে পাতা খসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের পটে ভেসে উঠছিল অতীতের কথা। এভাবেই নির্জন দুপুরটা কাটে।

উপসংহার

বেলা পড়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি রােদের রং বদলাতে শুরু করেছে। আসছে বিকেল। নির্জন দুপুরে আমার গভীরতম সত্তা মৌনমুখর পূর্ণতার বাণীতে আলােড়িত হয়।

স্নেহের কাঙাল আমি- এই নির্জন দুপুরে আমি মনে মনে হেঁটে যাই – হেঁটে হেঁটে যাই।  কত স্মৃতি জাগে: কতদিন স্নেহহীন ভালােবাসাহীন গেছে দিন।

কতরাত বিনিদ্র স্বপ্নহীন একা চলে গেছে। ছােটো দীর্ঘশ্বাসে সেসব স্মৃতি ভেসে যায়। নির্জন দুপুরের হাওয়ার পায়ে পায়ে তা ভেসে ভেসে যায়।