একটি নদীর আত্মকাহিনী রচনা লেখ (গঙ্গা নদী)

ভূমিকা

আমার নাম বললে তােমরা সবাই চিনবে। আমি পতিতপাবনী। কাব্য, শাস্ত্র, পুরাণমতে আমি ‘পতিতােদ্ধারিণী গঙ্গা’। আরও অনেক নামের মধ্যে গঙ্গা নামেই তােমরা আমাকে বেশি জানাে।

শত শত বছর ধরে অনন্ত জলধারা বুকে নিয়ে আমি অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী। ভগীরথের হাত ধরে হিমালয় থেকে আমার মর্ত্যে অবতরণ।

হিমালয়ের তুররেখা চূড়ায় সূর্যকিরণ ঠিকরে পড়ে, বরফ গলে, আমার প্রাণ প্রবাহের হয় শুরু। ঝরণার ধারা নামতে থাকে, পাহাড়ের গা বেয়ে আমি নেমে পড়ি মাটিতে।

তারপর নানা ধারা হয়ে নানাভাবে আমি মিশে গেছি মূল স্রোতে। শীর্ণকায় জলধারা বহুধারার সঙ্গে মিলে শক্তি পেয়েছি, মানুষও আমার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে হয়েছে শক্তিমান। আমি গঙ্গা নদী।

আমার উৎস

  • ভৌগােলিক

মধ্য হিমালয়ের গাড়ােয়াল পার্বত্য অঞ্চলে আছে। গােমুখ তুষার গুহা। সেই তুষার গুহার ঝরনা থেকে আমার আত্মপ্রকাশ।

তারপর অনেক পার্বত্যপথ বেয়ে হিমালয়-দুহিতা নিঝরিণী বুকে ধারণ করে সমতলভূমিতে গঙ্গাসাগরে এসে সাগরের বুকে আত্মলীন হয়ে যাই। এতাে গেল ভূগােলের কথা।

  • পৌরাণিক

এবার পুরাণের কথা শােনাই। আমি ছিলাম পিতামহ ব্ৰত্মার কমণ্ডলুর মধ্যে। ভগীরথের সাধনায় আমি কমণ্ডলু থেকে বেরিয়ে তিনভাগে প্রবাহিত হয়েছি।

স্বর্গে আমার নাম ‘মন্দাকিনী’, পাতালে ‘ভগবতী’ মর্তে আমার নাম ‘গঙ্গা। আমার মর্ত্যে অবতরণের সময় মহাদেব তার জটাজাল বিস্তার করে আমার স্রোত ধরে রেখেছিলেন।

তাই আমি মহাদেবের জটা থেকে আসছি কথাটা মিথ্যে নয়।

গঙ্গা নদীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

বৈজ্ঞানিক মানুষ কোনো গল্প-কথার বিশ্বাস করে না। তারা বলে, “সূর্যতেজে বাষ্পীভূত সাগরবারি হিমাচলের শৈত্য-সংস্পর্শে ক্রমশঃ মেঘ ও তুষারে পরিণত হয়ে পরে সূর্যকিরণে গলে যে-তুষারনদীর সৃষ্টি করে, তেহরি-গাড়ােয়াল প্রদেশের গাের্মুখী’ নামক তুষারক্ষেত্র হইতে তেমনই একটি তুষারনদীই তরলম্বিত হয়ে আমার, অর্থাৎ ‘গঙ্গা’র সৃষ্টি করেছে”।

হরিদ্বারের নিকট সেটি সমভূমিতে নেমে, পূর্বমুখী হয়ে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, বঙ্গদেশে প্রবেশ করেই দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং  ‘ভাগীরথী’ নামে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে।

Read More:  একটি বন্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

পৌরাণিক তত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের সমন্বয়

আমার কাছে কিন্তু পুরাণও সত্য, বিজ্ঞানও সত্য। বিষ্ণুপদ নীল, নীল আকাশে আমার জন্ম। তুষারমৌলি নীল হিমাদ্রিই ধ্যানমগ্ন মহাদেব, এবং হিমালয়শীর্ষে দিগন্তবিস্তৃত ধুম কুয়াসাজালই ধূর্জটির পিঙ্গল জটা।

আর ভগীরথের শঙ্খধ্বনি? দূর সাগরের আহ্বান কি শবনিবং নহে? সেটির ডাকেই তো আমি হিমগিরির স্বর্গ ছেড়ে নিয়ে মর্ত্যে নেমে এসেছি।

তােমরা আমার স্নিগ্ধ জলে স্নান করেছ, দেহের দাহ জুড়িয়েছ, সন্ধে মন ও জুড়িয়েছে, তাই আমাকে বল ‘সন্তাপহারিণী।

জনশ্রুতি

আমাকে ঘিরে কত না কিম্বদন্তী প্রচলিত। ব্রয়ার কাছে আমি ছিলাম।

সগর বংশের পুত্রদের বাঁচানাের জন্য ভগীরথ আমাকে পাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য তপস্যা করলেন। তিনি অনুমতি পান আমাকে মর্তে আনার জন্য।

আমাকে মর্তে ধারণ করার দায়িত্ব নেন মহাদেব। ভগীরথ আমাকে নিয়ে এলেন মর্তে। পথে তপস্যারত জহ্নমুনির সরঞ্জাম ভেসে গেল আমার স্রোতে। কুদ্ধ ঋষি আমাকে পান করে নিলেন, আমি হলাম উদরস্থ।

ভগীরথ জহ্নমুনিকে তুষ্ট করলেন। নিজের উরু কেটে তিনি আমাকে প্রবাহিত করে দিলেন।

সেজন্য আমার নাম হল জাহ্নবী। নেমে এলাম মর্ত্যে, পৃথিবীর একাংশ বেয়ে পাতালে-গেলাম সমুদ্রে। আমার জলস্পর্শে সগর রাজার অভিশপ্ত পুত্ররা প্রাণ ফিরে পায়।

সমতলের রূপ

আমি যখন প্রথম সমভূমিতে আসি-তখন সেই জায়গাটার নাম শুনলাম হরিদ্বার। তার আগে হৃষিকেশ-লছমনঝােলার কোল ঘেঁসে পাহাড়ী পথে আমি মায়াময় ছন্দে দোলায়িত হয়ে উঠি।

আমি যেদিক দিয়ে বয়ে গেছি, তার উভয় তীরে গড়ে উঠেছে। অগণিত শহর, নগর।

কোনাে নগরীতে কলকারখানা গড়ে উঠেছে, যেমন কানপুর। আমারই তীরে গড়ে উঠেছে পাটনা শহর, মুঙ্গের শহর। বিহারের শেষে পশ্চিমবঙ্গের কাছে এসে দ্বিমুখী স্রোতে বয়ে গেছি।

পূর্ববঙ্গে আমাকে বলা হয় পদ্মা, পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা বা ভাগীরথী।

এক সময়ের ভারতের রাজধানী কলকাতা আমার তীরে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে বরুণা আর আমার মিলনে সৃষ্টি হয়েছে বারাণসী নগর। যমুনা আর আমার মিলনে সৃষ্টি হয়েছে এলাহাবাদ।

পশ্চিমবঙ্গে আমার একপারে দক্ষিণেশ্বর মন্দির অন্যদিকে বেলুড় মঠ গড়ে উঠেছে-যা শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা ও স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত স্থান।

Read More:  দার্জিলিং ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে রচনা লেখ

আমার যাত্রাপথ

আমার দীর্ঘ যাত্রাপথে আমি প্রথমে ঋষিক্যে-হরিদ্বার হয়ে এসেছি প্রয়াগে। সৃষ্টি হয়েছে প্রয়াগতীর্থ। এখানেই হয় বিশাল কুম্ভমেলা। প্রয়াগ থেকে আমি এসেছি বারাণসীতে।

বিশ্বনাথের চরণে প্রণাম জানিয়ে আমি এগিয়ে গেছি পাটলিপুত্রের দিকে।

পাটলিপুত্র থেকে আমি এগিয়ে গেছি রাজমহলের দিকে। এরপর নবদ্বীপের পাশ দিয়ে কলকাতা পেরিয়ে আমি চলে গেলাম কপিলমুনির আশ্রমের দিকে।

সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সাগরের বুকে। আমার এই ঝাঁপানােকে কেন্দ্র করেই হল গঙ্গাসাগর তীর্থ।

আমার বিভিন্ন অনুভূতি

আমার তীরে একদা কত নারী সতী হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে সহমৃতা হওয়ার তাদের সেই আর্ত কান্না শুনে আমিও কুলুকুলু রবে কত কেঁদেছি। তােমরা শােনােনি, শুনতে চাওনি।

কেউ না শুনুক সাগর শােনে আমার মনের কথা। কত মা তাদের মৃত শিশুকে আমার জলে ভাসান দেয়। আর আমি থরােথরাে বেদনায় কাঁপি। নারীদের প্রতি পুরুষ জাতির এই অবিচারে আমার ভীষণ রাগ হয়।

তীরের বর্ণনা

আমার তীরে তীরে গড়ে উঠেছে খেয়াঘাট। সেই ঘাটে চলাচল করে নৌকা, লণ্ড,স্টিমার, এমনকি জাহাজও। এর ফলে দুপারের মানুষের মেলবন্ধনও নিত্য নিয়ত ঘটে চলেছে।

কত জলচর প্রাণী, মাছ আমার কোলে বিচরণ করে বেড়ায়।

কত মানুষ আমার প্রবাহিত ধারায় স্নান করে, তৰ্পণ করে পুণ্য অর্জন করে। আমার তীরে কত যে শ্মশান তার কোনাে ইয়ত্তা নেই। কত মানুষ তার প্রিয়জনকে দাহ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, স্নান করে বাড়ি ফিরে যায়।

আমার তীরে মানুষের কীর্তি ও ইতিহাস

তােমরা আমার তীরে গড়ে তুলেছ কত নগর-নগরী। আমার তীরে আছে কত তীর্থস্থান। কত ব্যাবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র।

কত সেতু-রবীন্দ্রসেতু, নিবেদিতাসেতু, বিবেকানন্দসেতু, দ্বিতীয় হুগলিসেতু, ফারাক্কা ব্রিজ। আমি যে মা, আমি তােমাদের শুধু দিয়েছি-দু-হাত ভরে দিয়েছি।

বিজ্ঞানবিদরা বলে আমার উত্তর ও দক্ষিণ তীরে ১০০ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত আমার জন্য উর্বরা। ফলে আমার সন্তানেরা প্রভূত ফসল উৎপন্ন করে উত্তরসূরি নিয়ে বেঁচেবর্তে আছে। এটাই আমার আনন্দ ও সান্ত্বনা।

Read More:  SpotemGottem Biography, Girlfriend & More

বিভিন্ন গতি

আমার গতি ত্রিমুখী। মূল গতি গঙ্গোত্রী থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মধ্যে গঙ্গার মধ্যগতি-র সঙ্গে যুক্ত বহু উপনদী-রামগঙ্গা, গােমতী, ঘর্ঘরা, গণ্ডক, বুড়িগণ্ডক, কোশী প্রভৃতি। আমার নিম্নগতি ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

বর্তমান অবস্থা

আমাকে মর্তের লােকেরা কলুষনাশিনী, সর্ব-সন্তাপহারিণী, পবিত্র বলে মনে করতাে। এমনকি আমার তীরেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সভ্যতা। জীবনধারণের জল ও কৃষির উপাদান যুগিয়ে কৃষি সভ্যতাকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।

কিন্তু সেই আমি এখন সভ্যতার উদ্বৃত্তকে বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছি এবং কমে দূষিত হয়ে পড়ছি। তাই আমার পবিত্রতা এখন আর আমি রক্ষা করতে পারছি না, বরং দূষিত হয়ে পড়েছি।

কেননা আমার তীরের শহরের বর্জ্য, কলকারখানার বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রের রাসায়নিক ও কীটনাশক আমাকে দূষিত করেছে।

আমার তীরে কাপড় কাচা, গরু-মহিষ স্নান করানাের জন্য আমি ক্রমশ দূষিত হচ্ছি।

তারপর আমার তীরে যে সমস্ত গাছপালা ছিল তা নির্বিচারে কাটার ফলে আমার তীর ভেঙে ভেঙে আমার স্রোতকে ক্ষীণকায় করে দিচ্ছে, আমি আমার গতিপথে নাব্যতা হারাচ্ছি।

এখনাে উপায় আছে, আমাকে আবার পুরােনাে অবস্থায় ফিরিয়ে দেবার। সেজন্য চাই মানুষের সচেতনতা ও সরকারের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আমি আমার জন্য বলছি না। বলছি আমাকে ঘিরে যাদের স্বপ্ন, তাদের জন্য।

উপসংহার

এখনাে তাে অনেক ভগীরথরা আছে, যাদের আমাকে দরকার। আমি তাদের জন্যই বলছি, আমাকে পরিশুদ্ধ রাখুন, আপনারাও পরিশুদ্ধ হবেন।

বছরে আমার একবার পূজা করার প্রয়ােজন নেই, যদি আপনারা যে কারণে আমি দূষিত হচ্ছি, সেই কারণগুলি সম্বন্ধে সচেতন হন।

অনেকে ঘটা করে গঙ্গাসাগরে স্নান করতে যায়, কিন্তু আমি যদি দূষিত হয়ে যাই, তাহলে সেই স্নান কী পবিত্র হবে?

আমার হারিয়ে যাওয়ার আগে আমাকে নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তারা আর একবার নিজেদের স্বার্থে ভাবুন-আমাকে নিয়ে আপনারা কি করছেন?

আমি তাে নিজেকে তােমাদের কল্যাণে নিঃশেষে দিয়েছি। আমি কী শুধু দিয়েই যাব? আমিও তাে ফিরে কিছু চাই। তােমরা আমার স্নেহের প্রতিদান দিয়েছ আমার জলে দূষণ ঘটিয়ে। সেই দূষণ-জ্বালায় আমি জর্জরিত।